বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে বাদ পড়লেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফারুক


প্রকাশিত: ০৬:১৩ এএম, ২০ আগস্ট ২০১৬

আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ আছে যাদের কারো হাত, কারো পা আবার কারো চোখ নেই। কেউবা আবার কথা বলতে পারে না, কেউ কানে শোনে না। কিন্তু এতো সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অনেক মানুষ নিজগুণে তাদের নিজেদের করেছেন মহিমান্বিত ও সম্মানিত। তেমনই একজন হলেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভূল্লী এলাকার ফারুক আহম্মেদ।

তিনি স্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ করলেও নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় (১৯৯৬ সালে) তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। পরে অদম্য সাহস আর ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানে সমস্ত প্রতিকূলতা।

সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। লিখিত পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করে তিনি মৌখিক পরীক্ষাতেও অংশগ্রহণ করেন। মৌখিক পরীক্ষার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েও ক্যাডার বা ননক্যাডার পদে উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি।

ফারুক আহম্মদ বলেন, বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় পাস করার পর আমি মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি চলতি বছরের ১৫ মার্চ। প্রস্তুত হয়ে  ভাইভা বোর্ডে গিয়েছি। প্রথমে আমার বিষয়ে সব কিছু ধারাবাহিকভাবে বনর্ণা করি।

বোর্ডের চেয়ারম্যান আমাকে বলেন, ফারুক সাহেব আমরা আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল। তারপর যদি আপনি ক্যাডার হোন আপনার কর্মস্থলে কিভাবে যাতায়াত করবেন, সমস্যা হবে কিনা, নানা ধরনের প্রশ্ন করতে থাকেন।

এক পর্যায়ে একজন জাহানারা ইমাম সর্ম্পকে, সংবিধানের মূলনীতি বিষয়ে, ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। আমি সব কিছুই ভাল করে ব্যাখ্যা দিয়েছি। পরে চেয়ারম্যান সাহেব বললেন ‘বেস্ট অব লাক’ ফারুক সাহেব।

মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে আশা করেছিলাম, আমি ক্যাডার বা নন ক্যাডার পেয়েই যাব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক গত ১৭ আগস্ট ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হয়েছে। আমি যখন আমার রোলটি ক্যাডার অথবা ননক্যাডার লিস্টে না দেখি তখন মর্মাহত ও খুবই বিচলিত হই।

 দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফারুক আহম্মদ আরো বলেন, আসলে আমি ভালোই করেছি মৌখিক পরীক্ষায়। ভাইভা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, কোনো সমস্যা নেই আপনি সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আমি একজন দৃষ্ট প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও বিসিএসের সকল ধাপ পার করেও ভাইবা বোর্ড থেকে এভাবে বিমুখ হয়ে গেলাম। আমি আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলাম বলে মনে করি।

তিনি আরো বলেন, আমি আবার এই ধাপে কখন পৌঁছাবো। ৩৭তম বিসিএস পরীক্ষায় আবার অংশগ্রহণ করবো। পরবর্তীতে আবার প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি কিনা শঙ্কা বোধ করছি। আমি আমার জীবন চলার পথে যে ধাক্কা খেলাম, মনোবাসনা ছিল সেখান থেকে পিছিয়ে গেলাম এখন নিজেকে খুবই অসহায় মনে করছি। হয়তো আমার জীবনের পথ চলা কিছুটা হলেও থমকে গেল।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফারুকের পড়াশুনা ও বেড়ে ওঠা :

দৃষ্টি শক্তির হারানোর পর পরিবারের উৎকণ্ঠা ও হতাশার মাঝেই শুরু হয় ফারুকের পথ চলা। ৫ বছর পর ২০০১ সালে জেনেছি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেলেও পড়াশুনা করা যায়। তারপর একটু আশাতীত হয়ে জীবনটা নতুন করে সাজানোর স্বপ্ন দেখা শুরু করি।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পড়া ব্যয়বহুল অপরদিকে পারিবারিকভাবে তেমন স্বচ্ছল ছিল না। ফারুক নিজ উদ্যোগে দিনাজপুর জবলি স্কুল রির্সোস সেন্টারে মোহাম্মদ হাফিজ উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে পড়াশুনা শুরু করেন। এরপর ২০০৩ সালে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। পরবর্তীতে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে ২০০৫ সালে এইচএসসি পাস করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্ম বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে ফারুক। তারপর ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।

ফারুকের পেছনে যার অবদান :

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ার পর বাবা-মার পরে ফারুকের এতোদূর অগ্রসর হওয়ার পেছনে যার সবচেয়ে বড় অবদান তিনি তার স্ত্রী তাহমিনা আহম্মেদ। এইচএসসি পরীক্ষার পর ফারুক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তিনি এখন দুই সন্তানের জনক।

তার স্ত্রী ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পড়াশুনা ও সংসার চালায়। বিসিএস পরীক্ষা পর্যন্ত ফারুকের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার পেছনে একমাত্র স্ত্রীর অবদান বেশি। গভবর্তী অবস্থায় পরীক্ষার আগে প্রতিটি বই পড়ে শুনাতো স্ত্রী তাহমিনা। স্ত্রী তাহমিনার চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতো বলে ফারুক জানান।

স্ত্রীর অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে দৃষ্টিহীন ফারুক বলেন, এই রকম বন্ধন যেন প্রতিটি মানুষের জীবনে হয়। তাহলে সমাজ অবশ্যই একদিন আলোকিত হয়ে উঠবে। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় আমার স্ত্রী তাহমিনা খুবই মর্মাহত।

এসএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।