প্রতিমা গড়তে ব্যস্ত কক্সবাজারের মৃৎশিল্পীরা


প্রকাশিত: ০৪:০৭ এএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬

ঈদুল আজহা উৎসবের রেশ এখনো কাটেনি। এরই মাঝে উঁকি দিচ্ছে সনাতনীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। কদিন বাদেই মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমন ঘটবে মর্তলোকে।

এ উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছেন কক্সবাজারের মৃৎশিল্পীরা। পড়েছে প্রতিমা তৈরির ধুম। এবার কক্সবাজার জেলায় ছোট-বড় ২৮৬ মণ্ডপের জন্য তৈরি হচ্ছে প্রতিমা। ফলে কারিগরদের দম ফেলার সময় নেই। সব কিছু শেষ পর্যায়ে এখন অপেক্ষা শুধু রঙের আঁচড় দেয়ার। পরম যত্নে মূর্তিগুলোতে অবয়ব দিতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

বিগত বছরের চেয়ে এবার প্রতিমা তৈরির খরচ দেড় থেকে দ্বীগুণ বেড়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এরপরও উৎসবমুখরভাবে পূজা সম্পন্ন করতে প্রতিমা ও মণ্ডপ তৈরিসহ আলোকসজ্জার কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন স্ব স্ব এলাকার পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা।
 
কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা জানান, গত বছর জেলার বিভিন্ন স্থানে ২৭৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছে। এবার ১০টি বেড়ে ২৮৬টি মণ্ডপে পূজা হবে।

তিনি বলেন, আগামী ৬ অক্টোবর মহাপঞ্চমী দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব শুরু হবে। ১১ অক্টোবর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই উৎসব। ৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী পূজা থেকে মণ্ডপে মণ্ডপে বেজে উঠবে ঢাকঢোল আর কাঁসার শব্দ। এবার দেবীর আগমন ও প্রস্থান হবে ঘোড়ায় চড়ে।
 
কক্সবাজার শহরের লালদীঘির পূর্বপাড়ের হোটেল বিলকিস সংলগ্ন শত বছরের পুরনো সরস্বতীবাড়ি মন্দির। এই মন্দিরের ভেতরে এখন শোভা পাচ্ছে ছোট-বড় শতাধিক নির্মাণাধীন প্রতিমা। বাঁশ-কাঠ আর কাদামাটি দিয়ে তৈরি প্রতিমাগুলো দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন সনাতন ধর্ম পূজারিরা।
 
মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমার কারুকাজ সম্পাদনে ব্যস্ত মৃৎশিল্পী (কারিগর) নেপাল ভট্টাচার্য। কাজের ফাঁকে তিনি রামু, টেকনাফ, উখিয়া, চকরিয়া, খুরুশকুলসহ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লোকজনের সঙ্গে প্রতিমা বিক্রি নিয়ে কথা বলছেন। দরদাম করছেন অনেকে। ধর্মীয় কাজের বিষয় বলে অনেকে বেশি দরকষাকষি না করেই দিয়ে যাচ্ছেন বুকিং মানি।

নেপাল ভট্টাচার্য বলেন, দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে এই মন্দিরে প্রতিমা তৈরি করছেন তিনি। দুর্গাপূজাকে উপলক্ষ করে গত দুই মাস আগে থেকে এবারও প্রতিমা তৈরিতে হাত দিয়েছেন। এ পর্যন্ত ২৮ সেট প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রতি সেটে দুর্গার সঙ্গে থাকে অসুর, সিংহ, মহিষ, গণেশ, সরস্বতী, কার্তিক ও লক্ষ্মী প্রতিমা।
 
তিনি আরো বলেন, আগে একটা প্রতিমা সেট তৈরি করতে খরচ হতো ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আর তা বিক্রি হতো ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। কিন্তু এখন বাঁশ, কাঠ, কাদামাটিসহ প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম দ্বিগুণ, তিনগুণ বেড়েছে। তাই প্রতি সেট প্রতিমা তৈরিতে খরচ পড়ছে ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। এখন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বেশি লাভে বিক্রি করা যাচ্ছে না।

কক্সবাজার শহরের প্রতিমা তৈরির আরেক কারিগর বাবুল ভট্টাচার্য (৪৭) বলেন, রামুর বাঁকখালী নদী থেকে কাদা মাটি কিনে এনে প্রতিমা তৈরি করতে হয়। তারপর কাঠ, সুতা, খড়, রং, কাপড় ও মুকুট দিয়ে এক সেট প্রতিমা তৈরি করতে সময় লাগে পাঁচদিন। কিন্তু প্রতিমা সেট বিক্রি করে তেমন লাভ হচ্ছে না। এরপরও ২৩ বছর ধরে এ পেশায় থেকে এক প্রকার মায়ায় আটকে গেছি। তাই টানাপড়নে থাকলেও পেশা ছাড়তে পারছি না।
   
Prothima

অপরদিকে শহরের ঘোনারপাড়া কৃষ্ণানন্দধাম মন্দিরে প্রতি বছরের মতো এবারও তৈরি করা হচ্ছে বিশাল দুর্গা প্রতিমা। চট্টগ্রাম থেকে আনা কারিগর অবিশ্রান্ত সময় ব্যয় করছেন এখানে।

ঘোনারপাড়া দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্বপন পাল বলেন, এই মন্দিরে প্রতিমা স্থাপন ও আলোকসজ্জার বিপরীতে খরচ হচ্ছে প্রায় সাত লাখ টাকা, যা গত বছর পাঁচ লাখ টাকায় হয়েছে।

কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও কেন্দ্রীয় কালী মন্দির পূজা উদযাপন কমিটির অর্থ সম্পাদক সুমন কান্তি দে জানান, বিগত বছরের চেয়ে এবার প্রতিমাসহ পূজার সকল আনুসাঙ্গিকের খরচ বেশি পড়ছে। গত বছর প্রতিমাসহ অন্যান্য খরচ মিলে সাড়ে চার লাখ টাকায় পূজা সম্পন্ন হলেও এবার ছয় লাখ টাকার উপর খরচ পড়ছে। অন্য সময়ের মতো এবারও চট্টগ্রাম থেকে শিল্পী এনে প্রতিমা ও মণ্ডপ তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
 
তবে, ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পূজার্থী ও দর্শনার্থী সবাইকে নিশ্চিত ভোগান্তি পোহাতে হবে। এ নিয়ে পূজা কমিটিসহ পাড়ার সবাই উদ্বিগ্ন।
      
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি রণজিৎ দাশ জানান, ১১ অক্টোবর লাখো ভক্তের উপস্থিতিতে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে দেশের সর্ববৃহৎ প্রতিমা বিসর্জন উৎসব হবে। তাই প্রতিবারের মতো এবারও নিরাপত্তার ব্যাপারে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হবে।

এ ব্যাপারে ২৩ সেপ্টেম্বর পরিষদের জরুরি সভা রয়েছে। আর ২৬ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে হবে দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা সভা।

এ বিষয়ে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলে রাব্বি বলেন, প্রতিমা বিসর্জনও কক্সবাজারের পর্যটনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকল ধর্মের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় একিভূত হয়ে সৈকতের বালিয়াড়িতে ওইদিন জড়ো হয়। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও অন্য সব বিভাগের সমন্বয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরির চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।