পঞ্চায়েত নিয়ে ফের উত্তপ্ত সুন্দ্রাটিকি গ্রাম
হবিগঞ্জের বাহুবলের সুন্দ্রাটিকি গ্রাম পঞ্চায়েত নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। এবার পঞ্চায়েত কমিটি দুই ব্যবসায়ীর পরিবারকে ‘একঘরে’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সোমবার গ্রাম পঞ্চায়েতের সভায় এমন কঠিন সিদ্ধান্তের পর থেকে দুই ব্যবসায়ীর ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জীবনযাত্রা দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে।
এ ব্যাপারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে ওই দুই ব্যবসায়ীর পরিবার মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে আবেদন করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম পঞ্চায়েতের এ সিদ্ধান্তকে মানবতাবিরোধী উল্লেখ করে মুরুব্বীদের স্ব-শরীরে হাজির হয়ে জবাবদিহিতা করার জন্য নোটিশ দিয়েছেন।
এলাকাবাসী জানায়, উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামের বাসিন্দা মৃত কলিম উল্লাহর ছেলে মামুন মিয়া ও ফারুক আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনারী, মুদি ও হার্ডওয়ার সামগ্রীর ব্যবসা করে আসছেন। সুন্দ্রাটিকি গ্রামের সঙ্গে আশপাশের গ্রামগুলোর সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেই ওই দুই ব্যবসায়ীর দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে থাকে। এতে তারা প্রায় প্রতিনিয়তই ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হন।
গত দুই বছর আগে সুন্দ্রাটিকি গ্রামের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী পূর্ব ভাদেশ্বর গ্রামবাসী ও রশিদপুর চা বাগানবাসীর মধ্যে এবং পাঁচ বছর আগে পূর্ব ভাদেশ্বর গ্রামের সঙ্গে অপর একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রতিটি সংঘর্ষের ঘটনা রশিদপুর বাজারে সংঘটিত হওয়ায় মামুন মিয়া ও ফারুক আহমেদের দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। এতে তাদের ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি হয়।
এদিকে, গত বছরের শেষ দিকে সুন্দ্রাটিকি গ্রাম পঞ্চায়েতের কিছু যৌথ মালিকানা জমি বিক্রি করা হয়। উক্ত জমি বিক্রির কিছু টাকা দিয়ে শিরণী করা হয় এবং অবশিষ্ট টাকা থেকে উল্লেখিত সংঘর্ষগুলোতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। কিন্তু ব্যবসায়ী মামুন মিয়া ও ফারুক আহমেদ কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। তারা এ ব্যাপারে গ্রাম পঞ্চায়েতের মুরুব্বীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সদুত্তর পাননি। এক পর্যায়ে তারা গ্রাম পঞ্চায়েতের কিছু যৌথ মালিকানা জমি দখল করে ঘর নির্মাণ করেন।
এর প্রেক্ষিতে সোমবার সকাল ১০টার দিকে স্থানীয় স্লুইচ গেইট অফিসে সুন্দ্রাটিকি গ্রাম পঞ্চায়েতের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পঞ্চায়েতের প্রধান মুরুব্বী ফরিদ মিয়া। সভায় ব্যবসায়ী মামুন মিয়া ও ফারুক আহমেদের উপস্থিতিতে একতরফাভাবে তাদের ‘একঘরে’ করা হয়।
সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, গ্রামবাসী ওই ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সাথে সকল প্রকার সামাজিক, ব্যবসায়ীক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে বিরত থাকবে। এ সিদ্ধান্ত লঙ্ঘনকারীকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত প্রচার হওয়ার পরপরই উল্লেখিত ব্যবসায়ীদের দোকানপাটে কেনাকাটাসহ স্বাভাবক জীবনযাপনে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
এ ব্যাপারে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সুন্দ্রাটিকি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান ফরিদ মিয়া বলেন, ব্যবসায়ী মামুন, ফারুক ও হারুন গ্রামের মুরুব্বীদের মানে না। তারা গ্রামের এজমালী (যৌথ মালিকানা) জমি দখল করে রেখেছে। তাদের সামাজিকভাবে চাপ সৃষ্টি করার জন্য কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, পঞ্চায়েতের এ মানবতাবিরোধী সিদ্ধান্ত বে-আইনি। এদেরকে আগামী সোমবার (১০ অক্টোবর) স্ব-শরীরে হাজির হয়ে জবাবদিহিতার জন্য নোটিশ করেছি এবং থানার ওসিকে একঘরে রাখা পরিবার দুইটিকে সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য নির্দেশ দিয়েছি।
প্রসঙ্গত, পঞ্চায়েতের বিরোধের জের ধরেই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মাটিচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় চার শিশুকে।
১২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ওই চার শিশু নিখোঁজ হয়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে গ্রামের পার্শ্ববর্তী ইছাবিল খালের পাশে বালুমহালে মাটিচাপা দেয়া অবস্থায় তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দেশ-বিদেশে বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ ব্যাপারে দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন/এআরএ/এবিএস