‘স্যার টাকা না পেলে সই করেন না’


প্রকাশিত: ০৩:৩৬ এএম, ২৮ নভেম্বর ২০১৬

কক্সবাজার আয়কর অফিসে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে আসাদের সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ করা হচ্ছে। ফাইল জমা নেয়া হলেও দেয়া হচ্ছে না প্রাপ্তি স্বীকারপত্র। আর টাকা ছাড়া কোনো প্রত্যয়নপত্র আশা করাও দুরাশা।

ফাইল জমা নেয়া প্রসঙ্গে উচ্চমান সহকারীর সাফ কথা ‘স্যার টাকা না পেলে প্রত্যয়নে সই করেন না’। তাই কর পরিশোধের বিপরীতে নয় তাদের চাহিদা মতো টাকা দিলেই কেবল মিলছে ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সনদ। এমনটিই অভিযোগ ভূক্তভোগীদের।
 
অথচ অফিসের দরজার বাইরে সাইনবোর্ড উল্লেখ রয়েছে, আয়কর নীতিমালার ৮২ এর ডাবল ‘বি’ ধারা মতে, নিজের প্রদর্শিত সম্পদের বিবরণী সম্বলিত আয়কর রিটার্ন সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দিতে আসলে তা গ্রহণ করে তাৎক্ষণিক প্রাপ্তিস্বীকার পত্র করদাতাকে হস্তান্তর করতে হবে। তার আবেদনের ভিত্তিতে সেদিনই ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট বা প্রত্যয়নপত্র দেয়া হবে।

কিন্তু একই অফিসের অপর সার্কেলের আওতাভুক্ত আয়কর দাতারা পরিচ্ছন্ন সেবা নিয়ে রিটার্ন জমা ও প্রত্যয়ন পাচ্ছেন। একই ভবনে দু’ধরণের সেবার পিছনে সার্কেল অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-কর কমিশনারদের দৃষ্টিভঙ্গিকে দায়ী করছেন ভূক্তভোগীরা।
 
সূত্র মতে, চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৪ এর আওতায় কক্সবাজার জেলা কর অফিসে কাজ করছে চারটি সার্কেল। শহরের খুরুশকুল রাস্তার মাথায় এস কে টাওয়ারের ৪র্থ তলায় সার্কেল-৮৫ (বৈতনিক) ও সার্কেল-৮৭ (উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চল) এবং ৫ম তলায় কক্সবাজার শহর ও সদর এলাকা নিয়ে সাকেল-৮৪ ও ৮৬ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
 
সার্কেল-৮৫ (বৈতনিক) ও সার্কেল-৮৭ (উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চল)’র উপ-কর কমিশনার হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন পদোন্নতি পাওয়া জাকারিয়া হোসেন। সেখানে সরকারি কর্মকতা, কর্মচারি এবং সরকারি, বেসরকারি কলেজ, কর্পোরেট অফিসের কর্মকর্তাগণ এবং উখিয়া-টেকনাফের ব্যবসায়ী ও বিত্তবানেরা কর দিয়ে থাকেন।

এ সার্কেলে জাকারিয়া হোসেন দায়িত্ব নিয়েছেন বিগত মাস ছয়েক আগে। এবারই তিনি প্রথম রিটার্ন জমা নেয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন এবং প্রথম বারেই তিনি কর দিতে আসা পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কক্সবাজার পল্লিবিদ্যুত সমিতির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, কাজের চাপ থাকায় ১৫-২০ জন কর্মকর্তা বেতন অনুসারে রিটার্ন পুরণ করে একজন অফিস স্টাফকে দিয়ে জমা দিতে পাঠান। কিন্তু উপ-কর কমিশনার জাকারিয়া রিটার্ন জমা না নিয়ে যার যার রিটার্ন নিজেদের এসে জমা দিতে বলে অফিস স্টাফকে ফিরিয়ে দেন। পরে সবাই মিলে ১০ হাজার টাকা তার হাতে পৌঁছানোর পর রিটার্ন জমা নিয়েছেন।
 
অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার দুপুরে একজন পেশাজীবীর রিটার্ন জমা দিতে তার কার্যালয়ে যায় এ প্রতিবেদক। সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে যথা নিয়মে উচ্চমান সহকারীকে রিটার্নটি জমা দিলে তিনি ৩০ নভেম্বরের পরে আসতে বলেন। এখন প্রাপ্তিস্বীকার পত্র দেয়া যাবে না বলেও জানিয়ে দেন তিনি।

প্রাপ্তি স্বীকার পত্র ও প্রত্যয়নটা আজই লাগবে বলে অনুনয় করলে তিনি বলেন, প্রত্যয়ন নিলে কিছু ফরমালেটিজ রয়েছে। কত জানতে চাইলে বলেন, স্যার তো টাকা বেশি না হলে সই করেন না। তিনি তিন হাজার টাকা দাবি করলে, অনেক অনুরোধের পর ১৫শ টাকায় নিয়ে দিতে সম্মত হন এবং অগ্রীম টাকা দিয়ে আসায় ৩০ নভেম্বরের পরে দেয়ার কথা বলা প্রাপ্তি স্বীকার পত্র ও প্রত্যয়ন সন্ধ্যায় ফোন করে হস্তান্তর করেন তিনি।

এসময় শহর এলাকার ঠিকাদার দেলোয়ার হোসেনে সঙ্গে দেখা হয়। তিনি একই ভবনের অপর সার্কেল থেকে রিটার্ন জমার পর প্রাপ্তি স্বীকার ও প্রত্যয়ন নিয়ে বের হচ্ছিলেন। কত টাকায় পেয়েছেন জানতে চাইলে, দেলোয়ার বলেন, কোনো টাকাই লাগেনি। উপ-কর কমিশনার জ্ঞানেন্দু বিকাশ তার উচ্চমান সহকারীকে প্রত্যয়নটি বের করে আনতে বলেন। এটি হাতে পেয়ে সই করে নিয়মিত কর পরিশোধের তাগাদা দিয়ে হাসিমুখে বিদায় দেন কর্মকর্তা।

একই অফিসের দুটি চিত্রের কথায় খটকা লাগায় সেখানে রোববার সেবাপ্রার্থী সেজে যাওয়া হয়। গিয়ে দেলোয়ারের কথার সত্যতাই মিলেছে। মাহবুবা এন্টারপ্রাইজের রিটার্ন জমার প্রত্যয়নটি অল্পক্ষণ পরই হস্তান্তর করেন সংশ্লিষ্টরা।
 
সে অফিস থেকে নিচের তলায় ৮৫ সার্কেলে আবার ঢুমেরে দেখতে গিয়ে মিলে অন্য কাহানী। শহরের পৌর প্রিপ্যারটরি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুমন মজুমদার গত আর্থিক অসঙ্গতির কারণে গত বছরের রিটার্ন জমা দিতে পারেননি। এবার দু’বছরের টাকা একসঙ্গে দিতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়েন।

তাকে জানানো হয়, দৈনিক ৫০ টাকা হারে এক বছরে ১৮ হাজার ২৫০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। পরে নিজের চাকরির বেতন নিয়মিত রাখতে তিনি একটি রফাদফা করে বিষয়টি সমাধান করলেন। তবে, কত টাকায় তা করা হলো এটি শেয়ার করতে চাননি শিক্ষক সুমন।
 
এরকম আরো অনেক অভিযোগের বিষয়ে, রোববার বিকেলে ৮৫ ও ৮৭ সার্কেলের উপ-কর কমিশনার জাকারিয়া হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ গুলো অস্বীকার করে বলেন, রিটার্নে উল্লে­খ করা তথ্য মনঃপুত না হলে অফিস তা জমা না নিয়ে ৯৩ ধারায় তদন্তে দিতে পারে।

আয়কর নীতিমালার ৮২ এর ডাবল ‘বি’ ধারার কথা উল্লে­খ করা হলে তিনি কথা না বাড়িয়ে বলেন, কে অভিযোগ করেছে তার ফাইলের নামটি অথবা ব্যক্তিকে নিয়ে আসুন।

শনিবারের নিজের অভিজ্ঞতা ও টাকা দিয়ে প্রত্যয়ন নেয়ার বিষয়টি উল্লে­খ করলে বলেন, আমার নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ টাকা নিয়ে থাকলে আমি জানি না।

কিন্তু অফিস কর্তা হিসেবে দায়টি তার উপর বতায় কিনা জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর করেননি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জানতে চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৪ এর অতিরিক্ত কর কমিশনার মোহাম্মদ মফিজ উল­াহর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এমনটি কখনো কাম্য নয়। এরপরও যখন অভিযোগ সম্পর্কে জেনেছি খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কর ও প্রশাসন) আবদুর রাজ্জাক বলেন, কর প্রদান সহজতর ও এটি সম্পর্কে সাধারণ ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সরল ধারণা জন্মানোর মতো আচরণ করতে সবাইকে নির্দেশনা দেয়া আছে। কোনো ফাইল সম্পর্কে গুজামিল চোখে পড়লে পরবর্তীতে ৯৩ ধারায় ব্যবস্থা নেয়া যায়। কক্সবাজারে ভোগান্তি সম্পর্কে খোঁজ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।