ঠাকুরগাঁও তাঁতপল্লিতে পুঁজির অভাব


প্রকাশিত: ০৫:১১ এএম, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৬

ঠাকুরগাঁও সদরের কিসমত কেশুরবাড়ি গ্রামে কান পাতলেই শোনা যায় তাঁতের খটখট শব্দ। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় কারিগর নিপুণ হাতে বুনে চলেছেন কম্বল। এই তাঁতশিল্প এখানকার মানুষকে আর্থিক সচ্ছলতা দিলেও এখন সেই দিন অতীত।

পুঁজির অভাবে তাঁতিরা এ ব্যবসায় আগের মতো আর বিনিয়োগ করতে পারছেন না। বেশির ভাগ তাঁতিই পুঁজি জোগাতে মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের সুদের জালে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে সুদ পরিশোধেই চলে যাচ্ছে তাঁতির পুঁজির বড় অংশ।

কিসমত কেশুরবাড়ি গ্রামের তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এখানে শুরু হয় তাঁতযন্ত্রের মাধ্যমে কম্বল তৈরির কাজ। গ্রামে প্রায় ৫০০ পরিবারের বসবাস। তাদের অধিকাংশই কম্বল বুননের কাজে জড়িত। তারা বলসুতা, পুরোনো সোয়েটারের উল দিয়ে কম্বল, গায়ের চাদর, মাফলারসহ আরও অনেক কিছু তৈরি করেন।

destroy

খট খট শব্দে মুখরিত ঠাকুরগাঁওয়ের কেশুরবাড়ির তাঁতপল্লি। দিন-রাত শীতের কম্বল তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাঁতি পরিবারের সদস্যরা। কম্বল কিনতে ইতোমধ্যে গ্রামটিতে ভিড় জমাচ্ছেন পাইকাররা। তবে পুঁজির অভাবে চাহিদা মতো কম্বল তৈরি করতে পারছেন না বলে জানান তারা।

সরেজমিনে জানা যায়, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এখানকার পাঁচ শতাধিক পরিবারের প্রায় ১২শ মানুষ বংশানুক্রমে এখনও তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তারা আগে শাড়ি-লুঙ্গি তৈরি করলেও বর্তমানে শুধু কম্বল তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই দুই থেকে ছয়টি পর্যন্ত তাঁত রয়েছে। এর কোনোটা চাকাওয়ালা, আবার কোনোটা একেবারেই বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি। সকাল থেকেই বাড়ির নারী-পুরুষসহ সবাই লেগে পড়েন কম্বল তৈরির কাজে।

তাঁত কারিগর ধনেশ দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, শীত আসলে আমরা এই কম্বল বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাই। কিন্তু গরমের সময় কম্বল তৈরি করার কাজ থাকে না। তখন শহরে গিয়ে রিকশা চালাতে হয় বা ইট ভাটায় কাজ করতে হয়। কম্বল বিক্রয়ের টাকায় কিছুদিন ভালোভাবে চলা যায় তারপরে আবার কষ্ট শুরু। সরকার যদি কোনো সহযোগিতা করতো তাহলে সারাবছর আমরা তাঁত এর কাজ করতে পারতাম।

তাঁত কারিগর সুরেন্দ্র দেবনাথ অভিযোগ করে বলেন, সুতার দাম এখন অনেক বেশি, কম্বলও বেশি বিক্রি হয় না। এছাড়া মেশিনের কম্বল অনেক কম দাম দিয়ে পাওয়া যায়। তাই হামার কম্বল কেহ নিবা চাহে না। এই কম্বল বিক্রির টাকায় কোনো মতে চলছে সংসারের খরচ।

তাঁত কারিগর পরেন্দ্র দেবনাথ বলেন, ছোট থেকেই এই কাজ করি। এখন তার ছেলে-মেয়েরা করছে। বংশের সবাই এই কাজের সঙ্গে জড়িত। কষ্ট হলেও এই কাজ আমাদেরকে ধরে রাখতে হবে। বংশের চিহ্ন এই তাঁত।

Thakurgaon

তিনি আরো বলেন, আমাদের নিজের কোনো পুঁজি নাই। অর্থনৈতিকভাবেও আমরা এখনও সচ্ছল না। ঋণ নিয়ে সুতা কিনে কম্বল তৈরি করছি। সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা পেলে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

কম্বল কিনতে আসা অনেক পাইকার বলেন, এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হলে এই পুরোনো দিনের শিল্পকে বাঁচানো যাবে। তাঁত কারিগরদের পুঁজি না থাকায় তারা বেশি সুদে ঋণ দিয়ে কম্বল তৈরি করে লাভবান হতে পারছেন না।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৈমুর রহমান বলেন, এখন তাঁতিদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা দরকার। সরকারি তরফ থেকে যদি সহযোগিতা দেওয়া হয় তাহলে এই তাঁতি পরিবারগুলো তাদের জীবনমানের পরিবর্তন ঘটাতে পারবে।

এফএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।