দেশপ্রেমের অনন্য উদাহরণ দিনমজুর আনোয়ার খাঁ


প্রকাশিত: ০৪:৩৯ এএম, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬

হবিগঞ্জে দেশপ্রেমের এক অনন্য উদাহরণ দেখিয়েছেন এক দিনমজুর। নিজ বাড়িতে নির্মাণ করেছেন শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধ। আর সেখানেই প্রায় ২০ বছর ধরে পালন করে আসছেন মহান স্বাধীনতা, বিজয় ও ভাষা দিবস।

প্রথমে বাঁশ দিয়ে তা নির্মাণ করলেও কয়েক বছর আগে তা পাকা করেছেন। নির্মাণ শ্রমিকের ব্যয় মিটানোর ক্ষমতা নেই। তাই সন্তানদের নিয়েই নিজ হাতেই তা পাকা করেছেন।

তার এসব কাজ দেখে প্রতিবেশীরা তাকে পাগল বলে। অনেকেই আবার তাকে আঁড় চোখে দেখে। কেউবা বলে ভাত খাওয়ার মুরদ নেই, যতসব পাগলামী। কিন্তু মানুষের কোনো কথাই দমিয়ে রাখতে পারেনি অদম্য পরিশ্রমী এ দেশপ্রেমিক মো. আনোয়ার খাঁকে। শ্রদ্ধানিবেদন করে চলছেন দেশের সূর্যসন্তানদের প্রতি।

মো. আনোয়ার খাঁ জানান, দিনমজুরের কাজ করে তিনি সংসার চালান। ৩ ছেলে ও ১ মেয়ের জনক তিনি। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। আর ৩ ছেলেকেই স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় পড়াচ্ছেন। অতিকষ্টে দিনাতিপাত করলেও দেশপ্রেমে তার বিন্দুমাত্রও ভাটা পড়েনি।

সন্তানদের বই দেখে প্রায় ২০ বছর আগে বাঁশ দিয়ে শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। তখন থেকেই মহান স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও ভাষা দিবসে সন্তানদের নিয়ে এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করে চলেছেন। তখন থেকেই তাকে প্রতিবেশীরা পাগল বলতো।

তিনি বলেন, নির্মাণ শ্রমিকের টাকা দেয়ার মতো আমার সামর্থ নেই। তাই কয়েক বছর আগে নিজ হাতেই তা পাকা করেছি। আমার ছেলেরা আমাকে সাহায্য করেছে। কারও কোনো কথায় আমাকে পিছপা করতে পারেনি। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো  তা পালন করে যাব। আশা করি আমার সন্তানরাও এটি ধরে রাখবে।

তার ছেলে বিবিএর ছাত্র মো. এমরান খাঁ বাবার এমন দেশপ্রেমে নিজেরা গর্ববোধ করেন বলে জানান।

তিনি বলেন, আমার বাবার কোনো শিক্ষা নেই। একজন দিনমজুর হয়েও আমাদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। পাশাপাশি আমাদের সংসার খরচের টাকা বাঁচিয়ে তিনি শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছেন। আমরা তাকে সহযোগিতা করেছি। আমার বাবা বিভিন্ন দিবসে ফুল কিনে এনে নিজের হাতেই ফুলের তোড়া বানান। আমাদের নিয়েই বাবা এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আমরা সব সময় বাবাকে উৎসাহ দেই।

প্রতিবেশী ফটিক শীল জানান, এখানে কোনো স্মৃতিসৌধ বা শহীদ মিনার আছে বলে তিনি জানেন না। তিনি কখনও দেখেননি। আর বাড়িতে এসব করার দরকারই বা কী?

habiganj

আরেক প্রতিবেশী যুবক মীর শামীম বলেন, আমরা দেখেছি তিনি বাড়িতে শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধ বানিয়েছেন। আমরা মনে করি এর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝেও দেশপ্রেম সৃষ্টি হবে। আমরা সবাই যদি তার মতো দেশপ্রেমিক হই, তবে এ দেশ সত্যিই সোনার বাংলা হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, প্রথমে যখন আনোয়ার খাঁ এটি বাঁশ দিয়ে বানিয়েছিলেন তখন অনেকেই লুকিয়ে গিয়ে তা ভেঙে ফেলতো। পরে তিনি এটি স্থায়ীভাবে পাকা করে বানান। মানুষ তার এসব দেখে পাগল বলতো।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, হবিগঞ্জ শহরতলীর গ্রাম উমেদনগর। যদিও এটি পৌর এলাকায় অবস্থিত, তবুও এখনও পুরোপুরিই গ্রাম রয়ে গেছে এটি। শহুরে পরিবেশ এ গ্রামটিকে টানতে পারেনি। এ গ্রামেরই শেষ প্রান্তের একটি মহল্লার নাম বন্দের বাড়ি।

ওই মহল্লারই বাসিন্দা মো. আনোয়ার খাঁ। পেশায় দিনমজুর। সহায় সম্বল বলতে মাত্র ১২ শতাংশ ভূমি। যার উপর রয়েছে তার বসতভিটা। এখানে দু’টি ছোট ছোট টিনের ঘর। পূর্বপাশের টিনের ঘরে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে নিজে বসবাস করেন। আর পশ্চিমের ঘরে সন্তানদের নিয়ে থাকেন তার বোন। মাঝখানে সামান্য আঙিনা।

নিজের ঘরের দরজার উত্তরাংশে নির্মাণ করেছেন শহীদ মিনার, আর দক্ষিণাংশে নির্মাণ করেছেন স্মৃতিসৌধ। ঠিক জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলেই এটি নির্মাণ করা হয়েছে। দু’টি স্থাপনাই একেবারেই নিখুঁত। একেবারে হুবহু। যে কেউ দেখলেই মনে করবেন যেন কোনো দক্ষ কারিগর তা নির্মাণ করে দিয়েছে।

বাড়ির দক্ষিণাংশে আঙিনার মাঝখানে মাটি দিয়ে উঁচু একটি অংশ রয়েছে। এখানে স্থাপন করা হয়েছে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড। প্রত্যেকটি দিবসেই এখানে জাতীয় পতাকা উড়ানো হয়। তিনি কারও সাহায্য চান না। শুধু একটি স্বাধীন দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ও বীরদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই এমনটি বছরের পর বছর ধরে করে যাচ্ছেন।

সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।