বিজয়ের ৪৮ ঘণ্টা পর মুক্ত হয় নওগাঁ


প্রকাশিত: ০৪:৫০ এএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬

আজ ১৮ ডিসেম্বর নওগাঁ হানাদার মুক্ত দিবস। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও প্রায় ৪৮ ঘণ্টা নওগাঁ মহকুমা হানাদারদের দখলে থাকে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পরও পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর প্রায় দুই হাজার পাকিস্তানি সেনা অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর নওগাঁয় যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় নওগাঁয়। আওয়ামী লীগের অ্যাড. বয়তুল্যাহকে (এমএনএ) আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। এ পরিষদের অন্যান্যের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সদস্য আব্দুল জলিল, আ.ন.ম মোজাহারুল হক (ন্যাপ ভাসানী), এমএ রকীব (ন্যাপ মোজাফফর) ও একেএম মোরশেদ প্রমুখ।

নওগাঁ ছিল ইপিআর ৭ নম্বর সেক্টরের অধিনে। নওগাঁ, নবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, হিলি, রাজশাহী, পাবনা ও নাটোর অঞ্চল নিয়ে সেক্টর এ গঠিত হয়। এই সেক্টরের প্রথম দিকে ক্যাপ্টেন গিয়াস, পরবর্তীতে মেজর নাজমুল হক এবং তার মৃত্যুর পর মেজর নুরুজ্জামান ছিলেন এই সেক্টরের অধিনায়ক।

১৮ মার্চের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন পাঞ্জাবি মেজর আকরাম বেগ। দুইজন ক্যাপ্টেনের মধ্যে একজন ছিলেন পাঞ্জাবি নাভেদ আফজাল, অন্যজন বাঙালি ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন। ২৫ মার্চের আগে মেজর আকরামের স্থলে বাঙালি মেজর নাজমুল হক নওগাঁয় ইপিআর এর কমান্ডিং অফিসার হিসেবে বদলি হয়ে আসেন। দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে মেজর বেগ তাকে চার্জ বুঝিয়ে দিতে অসম্মত হন। পরবর্তীতে কৌশলে ২৪ মার্চ মেজর আকরাম বেগ ও ক্যাপ্টেন নাভেদ আফজালকে গ্রেফতার করা হয়।

সেইসঙ্গে পশ্চিম পাঞ্জাবের ঝিলামের অধিবাসী নওগাঁ মহকুমা প্রশাসক নিসারুল হামিদকেও গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা বন্দি অবস্থায় স্বপরিবারে নিহত হন। ফলে নওগাঁ মহকুমা সদ্য ঘোষিত স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়। এসময় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ নওগাঁর প্রশাসনিক দায়িত্বভার গ্রহণ করে।

২৫ মার্চ পাক হানাদারদের আক্রমণের শিকার হলেও নওগাঁ মুক্ত ছিল প্রায় এক মাস। ২২ এপ্রিল নওগাঁ পাক হানাদারদের দখলে চলে যায়। প্রায় সাড়ে ৭ মাস ধরে পাক হানাদার বাহিনী জেলার বিভিন্ন স্থানে চালায় হত্যা, লুট, অগ্নি সংযোগ, ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতন ও মানবতা বিরোধী অপরাধ।

১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঢাকায় আত্মসমর্পণের খবর শোনার পর মুক্তিবাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার জালাল হোসেন চৌধুরী নওগাঁ সদরের গড়ের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরের দিন সকাল ৭টার দিকে গড়ের বাড়ি থেকে প্রায় ৩৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা নওগাঁ শহরের দিকে অগ্রসর হন।

Naogaon

১৭ ডিসেম্বর, শীতের সকাল। মুক্তিবাহিনী জগৎসিংহপুর ও খলিশাকুড়ি গ্রামে আসতেই পাকিস্তানি সেনারা মর্টার শেল ছোড়া শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা শহরের ভেতরে যতোই অগ্রসর হচ্ছিল পাকিস্তানি সেনাদের মর্টার শেল নিক্ষেপ ততোই বাড়ছিল। জালাল হোসেন চৌধুরীর নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা আক্রমণ করলে শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। দুই বাহিনীর মধ্যকার দূরত্ব একেবারে কমে আসে। এ যুদ্ধে হতাহতের ঘটনা ঘটে। মাঝেখানে যমুনা নদী। রাত পর্যন্ত এ যুদ্ধ স্থায়ী ছিল।

১৮ ডিসেম্বর শনিবার। সকালে বগুড়া থেকে অগ্রসরমান ভারতীয় মেজর চন্দ্রশেখর, পশ্চিম দিনাজপুর বালুরঘাট থেকে নওগাঁ অভিমুখে অগ্রসরমান পিবি রায়ের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী নওগাঁয় প্রবেশ করে। হানাদার বাহিনীর তখন আর করার কিছুই ছিল না। ফলে সকাল ১০টার দিকে প্রায় দুই হাজার পাকসেনা নওগাঁ কেডি স্কুল থেকে পিএম গার্লস স্কুল, সরকারি গার্লস স্কুল, পুরাতন থানা চত্বর এবং এসডিও অফিস থেকে শুরু করে রাস্তার দু’পাশে মাটিতে অস্ত্র রেখে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে নতমস্তকে আত্মসমর্পণ করে।

এসময় নওগাঁর বিহারী সম্প্রদায় স্বপরিবারে কেডি সরকারি স্কুলে আশ্রয় নেয়। তৎকালীন নওগাঁ মহকুমা প্রশাসক সৈয়দ মার্গুব মোরশেদ মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীকে স্বাগত জানান। বর্তমান পুরাতান কালেক্টরেট (এসডি) অফিস চত্বরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেখানে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা পতাকার প্রতি সালাম জানিয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন। নওগাঁ হানাদারমুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড হারুন-অল-রশিদ জানান, স্বাধীনতার ৪৫ বছর হলেও নওগাঁয় বেশির ভাগ মুুক্তিযোদ্ধা অসহায় ও মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেক মুুক্তিযোদ্ধা কাগজ হারিয়ে ফেলেছে। আবার মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নাম লিখলে হয়তো মেরে ফেলবে এই ভয়ে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ পড়ে আছেন।

মুক্তিযোদ্ধা হয়েও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম না থাকায় তারা সরকার থেকে কোনো সাহায্য বা সহযোগিতা পাননি। মূলত তারা মুক্তিযোদ্ধা হয়েও অসহায় ও মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

আব্বাস আলী/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।