তিস্তা সেচ কমান্ড এলাকায় সেচের জন্য হাহাকার
ফের তিস্তা পানি শূণ্য হয়ে পড়েছে। নদীতে পানির প্রবাহ না থাকায় তিস্তা সেচ কমান্ড এলাকার মাটির তলদেশেও পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। ফলে সেচ নির্ভর বোরো আবাদের জমিগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে পড়ছে।
কৃষকরা বলছেন তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যা আদায়ে এবং ভারতের এক তরফাভাবে গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করার প্রতিবাদে এবং সেচের দাবিতে তারা এই বিক্ষোভ ও সমাবেশ করতে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন।
কৃষকরা জানায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারী থেকে বাংলাদেশের ঢাকায় তিন দিনের সফর শেষে ফিরে গেছেন। ভারতে ফিরে যাওয়ার সময় মমতা তার উপর আস্থা ও ভরসা রাখার কথা বলে যান। তার আগমন ও ফিরে যাওয়ার পর তিস্তা নদীতে বেশ পানির প্রবাহ পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে মাটির তলদেশে পানির স্তর ছিল ভালই। এতে করে তিস্তা সেচ কমান্ড এলাকার খালে পানি পাওয়া গেছে। কিন্তু হঠাৎ করে গত ১৫ দিন হতে নদীর পানি কমতে থাকে। বর্তমানে পানি প্রবাহ নেই বললেই চলে। এতে দিন দিন সেচ কার্যক্রম কমতে কমতে শূণ্যের কোঠায় নেমে আসে। ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পের সকল খাল শুকিয়ে গেছে।
মাটির নিচেও পানির স্তর নিচে চলে গেছে। এতে বোরো ক্ষেতগুলো সেচের অভাবে মরে যাওয়া উপক্রম হয়েছে।
এদিকে সোমবার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারেজে নদীর পানি প্রবাহ কত ছিল তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন ডালিয়ার তিস্তা ব্যারাজের সংশ্লিষ্টরা। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্তা বললেন নদীতে পানি নেই বলেই তো সেচ চলছে না। আর মাটির তলদেশে ও পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। সেচ নির্ভর বোরো আবাদে পানির অভাবে কৃষকরা পড়েছে চরম বিপাকে। তিনি বলেন শুধু এসবে নয়, নদীর পানি সংকটের প্রভাব পড়েছে মাছ ধরা জেলে পরিবার। হুমকিতে পড়েছে জীব বৈচিত্র্য ও নদীর পরিবেশগত ভারসাম্যতা।
সরেজমিনে তিস্তার পাড়ের ডালিয়া গ্রামের কৃষক রনজিত কুমার জানায়, ২বিঘা জমিতে তিস্তার পানিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করি। কিন্তু গত ১৫দিন থেকে জমিতে পানি দিতে না পারার কারণে ক্ষেতের ফসল নষ্ট হচ্ছে। একই গ্রামের মতিয়ার রহমান জানায়, গত ১৫দিন থেকে তার ৮বিঘা জমিতে কোন পানি দিতে না পারার কথা। তিনি আরও বলেন, বোরো আবাদের বাম্পার ফলনের স্বপ্ন এবার গুরেবালিতে পরিণত হবে।
তিস্তা অববাহিকার মানুষজন মন্তব্য করে বলছেন স্মরণকালে ৩২ বছরের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে পানি শূণ্যতায় পড়েছে তিস্তা নদী। ফলে সেচ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। তিস্তা অববাহিকার সাথে একিভূত রংপুর ও দিনাজপুরের আট জেলায় পানির স্তর মারাত্মকভাবে নিচে নেমে গেছে। পুকুর, নালা, জলাশয়গুলো শুকিয়ে গেছে। টিউবওয়েল, বিদ্যুতচালিত মোটর ও ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিনেও পর্যাপ্ত পানি উঠছে না।
সুত্র মতে চলতি মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকায় ২৮ হাজার ৫০০ হেক্টরে সেচ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছিল। শুধু তিস্তা নদী নয় পানি সংকটে উত্তর জনপদের সকল নদী এখন মরুভূমিতে পরিণত হতে বসেছে। অনেকে বলছেন তিস্তা নদীর পানি সংকটের প্রভাব যে কত নদীতে গিয়ে পড়েছে তার ঠিক নেই।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা যায়, তিস্তায় পানি না থাকায় তিস্তা ব্যারেজ সেচনির্ভর ক্যানেল সংলগ্ন বগুড়া, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বোরো ধানের জমিতে পানি সংকটে কোনো সেচ দেয়া যাচ্ছে না। বোরো ক্ষেতের জমিগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বোরো চারাগুলো মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষক সমিতির নেতাদের অভিযোগ পানি যেভাবে কমতে শুরু করছে তাতে কমান্ড এলাকার কোন জমিতে গত ১৫দিন থেকে সেচের পানি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। পানির চাপ কম থাকার কারণে প্রধান সেচ খালে পানি থাকলেও শাখা ক্যানেলে পানি যাচ্ছে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে রংপুর-নীলফামারী অঞ্চলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর পানি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। তিস্তার বুকজুড়ে এখন ধূ-ধূ বালুচর জেগে উঠেছে। পানির অভাবে ডালিয়া থেকে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত ১৫২ কিলোমিটার তিস্ত নদীতে এখন শুধুই বালু দৃশ্যমান হয়।
এমজেড/পিআর