বাংলা ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহারে কষ্ট পাই


প্রকাশিত: ০৫:১২ এএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

১৯৪২ সালের ৩১ অক্টোবর ঝালকাঠি শহরের পশ্চিম চাঁদকাঠি এলাকার স্কুল শিক্ষক আছমত আলী সরদারের ঘরে জন্ম নেন এসএম শাহজাহান। ১৯৪৬ সালে পূর্ব বাংলার কিংবদন্তি রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি ঝালকাঠির বারচালায় এক জনসভায় আসেন। তখন মাত্র ৪ বছর বয়সে সেই বরণ্যে রাজনীতিবিদের বক্তব্য শুনতে ঘর থেকে পালিয়ে যান এসএম শাহজাহান।

বক্তব্য শুনে শিশু বয়সেই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন তিনি। পিতা আছমত আলী সরকারি বিদ্যালয়ে চাকরি করার সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাকে পড়াশুনা করতে হয়েছে। এজন্য তার পড়াশুনার মাঝে ধারাবাহিকতারও ব্যত্যয় ঘটেছে।

১৯৫২ সালে সরকারি বালক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় কিশোর বয়সেই তিনি মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে ঝালকাঠির পথে নামেন।

ভাষা সৈনিক প্রফেসর এসএম শাহজাহান স্মৃতিচারণ করে প্রতিবদেককে বলেন, মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্র ভাষা উর্দু করার ঘোষণা দেয়া হয়। সারা দেশে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ঝালকাঠিতে কোনো কলেজ ছিলনা, স্কুল পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীরাই সেদিন বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে পথে নেমেছিল।

Jhalokathi
শাসক চক্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ১৭ ফেব্রুয়ারি স্কুল ছাত্রদের নিয়ে ৯ সদস্যের সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। কমিটিতে জহুরুল আমীন সভাপতি, আমীর হোসেন সহ-সভাপতি, মোহাম্মদ আলী খান সম্পাদক এবং সদস্য হিসেবে ছিলেন আমিন হোসেন, মোজাম্মেল হক, মরতুজ আলী খানসহ আরও তিনজন। তবে তাদের নাম তিনি মনে করতে পারেননি।

সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে এখানকার স্কুল গুলোতে ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালনের চেষ্টা করা হলেও গ্রেফতারের ভয় দেখানোর ফলে তা সফল হয়নি। এদিন ঢাকায় গুলি বর্ষণের খবর পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে এখানে ছড়িয়ে পড়া মাত্রই উত্তেজিত ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়ে।

স্থানীয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো মিছিল বের হয়। মিছিলটি হরচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে পৌঁছলে ছাত্রদের কাছ থেকে ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর পেয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী লাইলি বেগমের নেতৃত্বে ছাত্রীরা বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেয়। মিছিলটি উদ্বোধন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাছে পৌঁছলে সেখানকার শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দেয়।

মিছিলের সম্মুখ ভাগে ছিলেন জনসাধারণের পক্ষে একমাত্র প্রতিনিধি সংবাদপত্রের এজেন্ট আবদুর রশীদ ফকির। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ এবং মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দানের স্বপক্ষে বিভিন্ন শ্লোগান দিয়ে শহর প্রদক্ষিণ শেষে সরকারি বালিকা বিদ্যালয় মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

ব্যক্তিগতভাবে তিনি কখনোই কোনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ছোট বেলা থেকেই নেতা ও শিক্ষাবিদদের সান্নিধ্য প্রিয় ছিল তার। কিশোর বয়সে অর্থাৎ উদ্বোধন বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ১৯৫৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বাবা এবং ৯ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ১৯৫৯ সালের ৫ মার্চ ৭ মাসের মাথায় তার মা ইন্তেকাল করেন। নিজেকেই রান্না করে খেতে হতো।

গর্ববোধ করে তিনি বলেন, ওই সময়ে বিদ্যালয়ের এক মাত্র মুসলিম ফার্স্টবয় ছিলাম আমি। উদ্বোধন স্কুল থেকেই ১৯৬১ সালে মেট্রিকুলেশন (এসএসসি), বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থকে ১৯৬৩ সালে ইন্টারমেডিয়েট (এইচএসসি), ১৯৬৫ সালে বিএ (ডিগ্রি) এবং ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে মাস্টার্স (এমএ) পাশ করি।

Jhalokathi
ইন্টারমেডিয়েট (এইচএসসি) পড়া অবস্থায় ১৯৬২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৪-৫ জন জাতীয় নেতা ঝালকাঠিতে আসেন। তখন তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে করমর্দন করে আত্মার প্রশান্তি লাভ করেন বলেও জানান প্রফেসর শাহজাহান।

ঝালকাঠি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরে করণিক পদে নিয়োগ পরীক্ষা দিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ৬ মাস চাকরি করার পর সেখান থেকে ইস্তফা দেন। ইতোমধ্যে ঝালকাঠি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি।

ঝালকাঠি মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসেবে ১৯৮১ থেকে ৮৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সারেংগল ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। বর্তমানে তিনি ব্যবসা করছেন।

ক্ষোভ প্রকাশ করে ভাষা সৈনিক এসএম শাহজাহান বলেন, বাংলা ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার দেখে নিয়মিতই কষ্ট পাচ্ছি। আমাদের ভাষা আন্দোলন ছিল দেশের সর্বত্র শুদ্ধ বাংলার ব্যবহার হবে বলে। কিন্তু এখনও অনেক সরকারি-বেসরকারি দফতরে বিদেশি শব্দের এবং অশুদ্ধ বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র এর প্রতিকার ব্যবস্থা না নিলে এটা দেখে কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

তিনি আরো বলেন, দেশে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। যাদেরকে সরকার বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিচ্ছে। আমাদের (ভাষা সৈনিকদের) সহায়তার দরকার নেই। আমরা চাই জীবনের শেষ বেলায় এসে যেন ভাষা সৈনিক হিসেবে স্বীকৃতিটুকু পাই।

এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।