তিনি সবার ‘শামীম আপা’


প্রকাশিত: ০৪:০৮ পিএম, ০৮ মার্চ ২০১৭

সাধারণ গৃহবধূ থেকে আজ তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। রাজনীতির মাঠেও রয়েছে সদর্প পদচারণা। সাধারণ মানুষের কল্যাণে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

হতদরিদ্র নারী, কলেজ পড়ুয়া দরিদ্র মেয়ে, বিধবা নারীরা যাকে কাছে ডাকলেই পাশে পায়, তাদের পাশে থেকে অধিকার আদায়ে যিনি সোচ্চার ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তিনি হলেন, শেরপুর সদর উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শামীম আরা শামীমা। শেরপুরে যিনি ‘শামীম আপা’ নামেই অধিক পরিচিত।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জাগো নিউজের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে শামীম আরা শামীমার কথা হয়। জানালেন নিজের সফলতা ও শিখরে উঠার গল্প।

তিনি বলেন, আগে থেকেই মানুষের কল্যাণে নানাভাবে কাজ করে আসছি। নিজে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্বামীও ব্যবসার পাশপাশি রাজনীতি করেন। আগে স্বামী পৌরসভার নির্বাচিত কাউন্সিলর ছিলেন। নির্বাচিত প্রতিনিধি হলে জনগণের সেবা আরও ভালোভাবে দেয়া যায়। অধিকারের জায়গা থেকে নিজেকে তখন ক্ষমতাবান মনে হয়।

স্থানীয়ভাবে এলাকার উন্নয়ন, জনগণের সেবা করা, সর্বোপরি নারী উন্নয়ন ও নারীদের কল্যাণে কাজ করার জন্যই স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হতে চেয়েছি।

নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সংগ্রাম করেই জীবনে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে হয়। ইন্টারমিডিয়েটে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর সংসার। সংসারের ঘানি সামলেই ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মালঞ্চ সেবা সমিতিতে মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করেছি।

এ সময় একইসঙ্গে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় শেরপুর জেলা মহিলা পরিষদের সঙ্গে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছি। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক ফোরামের শেরপুর জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি।

২০১৪ সালে ঢাকা বিভাগীয় উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান কমিটির নির্বাচিত সভাপতি ছিলাম। গত বছর জেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।

সদর উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করছি। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা, যৌতুক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং নারী জনপ্রতিনিধিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে কাজ করে যাচ্ছি। সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য জীবনের জন্য জীবন ফাউন্ডেশন থেকে ২০১২ সালে আমি ‘মাদার তেরেসা’ সম্মাননা পেয়েছি।

শামীম আরা জানান, সরকারি আনন্দ মোহন কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হওয়ার পর সেখানে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। সেখান থেকেই রাজনীতির হাতেখড়ি।

বিয়ের সময় স্বামী ছিলেন যুবলীগের শেরপুর শহর কমিটির সভাপতি। রাজনীতির প্রতি নিজের ঝোঁক আর স্বামীর অনুপ্রেরণায় ২০ বছর আগে আওয়ামী লীগের মাঠের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। ওই সময় শেরপুর পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড (নবীনগর ওয়ার্ড) আওয়ামী লীগের কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করি।

পরে ২০০১ সালে শেরপুর সদর উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হই। সেই থেকে অদ্যাবধি ওই পদে দায়িত্ব পালন করে আসছি।

Sherpur

তিনি বলেন, যেকোন সময় যেকোনো প্রয়োজনে জনগণ আমাকে তাদের কাছে পান, জনগণের পাশে থেকে সাধ্যমতো কাজ করতে চেষ্টা করি। সেজন্য তারা আমাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। যেকোনো বিপদে-আপদে ডাকলেই জনগণ আমাকে পায়।

‘শামীম আপা’ বলে ডাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে আমার এলাকার মানুষ যখন আমাকে ডাকে আমি তখনি তাদের কাছে ছুটে যাই। যেকোনো বিপদে-আপদে ডাকলেই জনগণ আমাকে কাছে পায়। কখনো কাউকে কোনো কারণ দেখাই না। বরং তার ওই সমস্যার সমাধান করাই আমার কাজ মনে করি। এ জন্যই হয়তো সবাই অামাকে শামীম আপা বলে ডাকে। আমি তাদের ডাকে যেমন সাড়া দিই তেমনি দারুণ উপভোগও করি।

তিনি বলেন, কাজ হোক বা না হোক জনগণের ডাকে সাড়া দেই। যেখানে যেতে বলে যাই। যাকে বলতে বলে, বলি। সালিশ-বিচার করি। এতেই জনগণ খুশি। তারা বলেন, বিনা পয়সায় আপনার কাছ থেকে আমরা সুবিধা পাই। এটাই হয়তো জনগণের ভালোবাসার কারণ।

তিনি আরও বলেন, জনগণ যেভাবে আমাকে ভোট দেয়, তাতে আমার নিজেকে জনগণের প্রতি কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে বলে মনে হয়। তারা পর পর দুইবার আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছেন। জনগণের ডাকে যখন আমি সাড়া দেই। তাদের কাছাকাছি থাকতে চেষ্টা করি, এতে কিছুটা দায়বদ্ধতা ঘুছে যায় বলে মনে হয়।

তিনি বলেন, হতদরিদ্র নারী, কলেজ পড়ুয়া দরিদ্র মেয়ে, বিধবাদের জন্য সেলাই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছি। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ করছি। যাতে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

আর্থিকভাবে নারীরা স্বাবলম্বী হলে পরিবারে, সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে, মূল্যায়ন করা হয়। এডিপির তহবিল থেকে যে বরাদ্দ পাই। সেখান থেকে এ কর্মসূচি চালু করেছি। ইতোমধ্যে ৪০ জন নারীকে এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা হয়তো অনেক কাজই করি জনগণের কল্যাণে। কিন্তু একটা কথা না বললেই নয়, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কেবল আমি নই, আমার মতো নারী জনপ্রতিনিধি কেউই নিজের মতো করে কাজ করতে পারছে না। উপজেলা পরিষদের পরিপত্রে নানা ধরনের গলদ রয়েছে। নীতিমালার মধ্যে সব জায়গায় গোঁজামিল রয়েছে। এগুলো দূর করা দরকার।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শামীম আরা জানান, পরিবার সহযোগী হলে নারীদের জন্য কোনো বাধাই বাধা হয়ে ওঠতে পারে না। আসলে পরিবার থেকে সবসময় আমি সহযোগিতা পেয়েছি। যে কারণে সামাজিক কর্মকাণ্ড, রাজনীতি, জনপ্রতিনিধিত্ব কোনো জায়গাতেই আমাকে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়নি। সামাজিকভাবেও আমাকে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়নি।

শামীম আরা বেগম বলেন, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করলে অন্য কোনো কিছু করা হয়ে ওঠে না। এখানে অনেক সময় দিতে হয়। তবে আমি যেহেতু রাজনীতির লোক তাই এর বাইরে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমাজকর্মী হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সময় ব্যয় করি।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করে বলেন, শেরপুর সদরে বাল্যবিয়ের প্রবণতা খুব বেশি। এ জন্য আমি বাল্যবিয়ে বন্ধে বিশেষভাবে কাজ করছি। বাল্যবিয়ের জন্য নারী শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। এটি বন্ধ হলে নারী শিক্ষারও উন্নয়ন ঘটবে, যৌতুক প্রথাও রোধ হবে। আমি সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।

হাকিম বাবুল/এএম/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।