সুনামগঞ্জের হাসান ও জাগো নিউজ
সাড়ে ছয় মাস বয়সী শিশু মো. হাসান। অসুস্থতার ভারে নুয়ে পড়েছে। জন্মদাতা বাবা আর গর্ভধারিণী মা সন্তানের অসুস্থতায় পাগলপ্রায়। কী করবে তা বুঝে উঠতে পারে না। দীর্ঘ চিকিৎসায় সন্তানের সুস্থ না হওয়া তাদেরকে যখন অস্থির করে তুলেছে তখন দেবদূত হয়ে সে দিশেহারা মা-বাবার পাশে দাঁড়ালেন জাগা নিউজের সহকারী বার্তা সম্পাদক (মফস্বল ডেস্ক) মো. মাহাবুর আলম সোহাগ।
তার সময়োপযোগী উদ্যোগে দীর্ঘ অসুস্থতার ভারে নুয়ে পড়া শিশু হাসান এখন অনেকটাই সুস্থ। তার বড় ধরনের কোনো সমস্যা নেই জানিয়ে হাসপাতাল থেকে তাকে ডাক্তার ছুটি দিলেন। আর দিশা ফিরে পেলেন মা-বাবা। বলছিলাম জাগো নিউজের সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি রাজু আহম্মেদ রমজানের ছেলে মো. হাসানের কথা।
যিনি দিনের পর দিন অসহায়, দুস্থ আর অসুস্থ মানুষের জন্য কাজ করে চলেছেন তিনিই এবার দাঁড়ালেন জাগো নিউজের এক প্রতিনিধির অসুস্থ সন্তানের পাশে, একটি দিশেহারা পরিবারের পাশে। আর নজির সৃষ্টি করলেন মিডিয়া ভুবনে। অভিভাবক হিসেবে আবির্ভুত হলেন জাগো নিউজ পরিবারে। তিনিই এক সুতোয় বাঁধলেন জাগো নিউজের পুরো দেশের প্রতিনিধিদের। বোঝালেন আমরা একটি পরিবার। সুখে-দুঃখে আমরা একে অপরের সঙ্গী। আর মো. মাহাবুর আলম সোহাগের প্রতি এবং জাগো নিউজের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই আমার এ লেখা।
পেছনের কথা
২৬ মার্চ মো. মাহাবুর আলম সোহাগ তার ফেইসবুকে স্ট্যাটাসে লিখলেন “আমাদের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি রমজান ভাইয়ের সাড়ে ছয় মাস বয়সী মেয়ে ১৫দিন ধরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। গতকাল রাতে রমজান ভাইকে ডাক্তার বলেছেন অন্য কোথাও নিয়ে চিকিৎসা নিতে। এটা শুনেই তিনি আমাকে ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করলেন। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম ঢাকা শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসার। আমাদের সারাদেশের প্রতিনিধিদের অনুরোধ করবো রমজান ভাইয়ের মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর। একে অপরের পাশে থেকে আপনারা এভাবেই ইউনিটি গড়ে তোলার চেষ্টা করুন, দেখবেন পাল্টে যাবে সমাজের অসহযোগিতামূলক ব্যবস্থা”।
সেই স্ট্যাটাস মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো প্রতিনিধিদের মাঝে। সবাই রমজান ভাইয়ের পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন। যে যার জায়গা থেকে সবাই সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলো। গড়ে উঠলো একটি জাগো পরিবার, একটি শক্ত ইউনিটি। যে পরিবার ও ইউনিটির মূল ভিত্তি হয়ে উঠলো ‘সুনামগঞ্জের হাসান’।
মাহাবুর আলম সোহাগের পরামর্শে ২৮ মার্চ সকালের দিকে ঢাকা শিশু হাসপতালে ভর্তি করা হলো শিশু হাসানকে। সেখানে তার চিকিৎসায় যেন কোনো কমতি না থেকে সেজন্য মাহাবুর আলম সোহাগ আবারো সকল প্রতিনিধিকে যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন।
মো. হাসানের অসুস্থতা নিয়ে আমার সঙ্গে একাধিকবার কথা হলো রমজানের। তার আকুতি আমাকে বিমর্ষ করেছে। তার কৃতজ্ঞতাবোধ তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুন। 
তিনি বললেন, তিনি জানতেন না যে মানুষটা তার অসুস্থ ছেলেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসতে বললেন তিনি নিজেই (মাহাবুর আলম সোহাগ) অসুস্থ। শারিরীকভাবে অসুস্থ একজন মানুষ কী করে আরেকজন অসুস্থ সন্তানের বাবাকে এতোটা সাহস ও শক্তি যোগাতে পারে তা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে রমজান ভাইয়ের।
‘সোহাগ ভাই কি মানুষ না ফেরেস্তা’ এমন প্রশ্নও ছুড়ে দিয়েছেন ফোনের ও প্রান্ত থেকে। আমি নির্বাক হয়ে তার কথাগুলো শুনছিলাম আর ভাবছিলাম।
গত ১১ বছর ধরে বিভিন্ন হাউজে কাজ করেছি কিন্তু একজন মফস্বল প্রতিনিধির প্রতি এতটা দায়িত্বশীল, কমিটমেন্ট কোনো হাউজে দেখিনি। তিনি শ্রদ্ধা জানাতে ভুল করেননি সোহাগ ভাই আর জাগো নিউজ পরিবারকে। সমানভাবে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন জাগো নিউজের প্রতিটি জেলা প্রতিনিধিকে যারা তাকে সাহস আর শক্তি যুগিয়েছেন, তার ছেলের জন্য দোয়া করেছেন আর তাকে সহযোগিতা করেছেন।
এক পর্যায়ের মাহাবুর আলম সোহাগের পরামর্শে বিষয়টি শেয়ার করলাম মানবিকগুন সম্পন্ন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিএম মশিউর রহমানের চিকিৎসক সহধর্মীনি ডা. নুসরাত কামালের সঙ্গে (যিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের আইএমও)। তিনি পরদিন সকালেই (২৯ মার্চ) একজন শিশু বিশেষজ্ঞ (নাম জানিনা) পাঠালেন। তিনি সযত্নে দেখলেন আর চিকিৎসা দিলেন।
রমজানকে আশ্বস্থ করলেন ভয় না পাওয়ার। বললেন ভয় পাওয়ার মতো কিছুই হয়নি। হাসানের চিকিৎসায় আন্তরিক সহযোগিতার জন্য আমি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই ডা. নুসরাত কামালকে আর সেই চিকিৎসককে (অচেনা) যিনি ছুটে এসেছেন অচেনা ছেলেটার চিকিৎসায়। 
এরই মধ্যে মাহাবুর আলম সোহাগের উদ্যোগে হাসানের চিকিৎসায় জাগো নিউজ পরিবার গড়ে তুললো একটি ফান্ড। যা ২৯ মার্চ রাজু আহম্মেদ রমজানের হাতে তুলে দেন জাগো নিউজের প্রধান বার্তা সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকার ও মাহাবুর আলম সোহাগসহ অন্যরা।
অবশেষে
৩০ মার্চ দুপুরের দিকে সকলের ভালোবাসায় মাত্র তিন-চার দিনে সুস্থ হয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতাল ছেড়েছে জাগো নিউজের সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি রাজু আহম্মেদ রমজানের ছেলে মো. হাসান। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সন্তানসহ বাড়ি ফিরেছে রমজান।
সুনামগঞ্জের হাসানকে সামনে রেখে জাগো নিউজের ৭১ জন প্রতিনিধিতে এক সুঁতোয় বেধেছেন আমাদের সকলের প্রিয়, শ্রদ্ধেয় মাহাবুর আলম সোহাগ। তার এ উদ্যোগ আর প্রচেষ্টাকে দূর পাহাড়ি জনপদ থেকে স্যালুট জানাতেই আমার এ লেখা। তিনিই বুঝিয়ে দিলেন ‘মানুষ মানুষের জন্য’। একটি উদ্যোগ যে অনেক বড় সমস্যার সমাধান এনে দিতে পারে তা আবারও প্রমাণ করলেন শ্রদ্ধেয় মাহাবুর আলম সোহাগ।
এফএ/এমএস