হাওরে সাতশ কোটি টাকার মাছ বিনষ্টের আশঙ্কা
নেত্রকোনার ছোট বড় ১৩৪টি হাওরে প্রায় হাজার কোটি টাকার বোরো ফসল বিনষ্টের পর এবার সাতশ কোটি টাকার মাছ বিনষ্টের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। হাওরের মাছ স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে সারা বছর দেশে-বিদেশে রফতানি করা হয়ে থাকে।
হাওরে মাছের মড়ক দেখা যাওয়ায় দুঃচিন্তায় পড়েছেন হাওর পাড়ের বাসিন্দারা। সম্প্রতি বোরো ফসল হারিয়ে দিশেহারা কৃষকরা । কৃষক ছাড়াও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জেলার মৎস্যজীবীরা।
জানা গেছে, গত দুইদিনে ডিঙ্গাপোতাসহ জেলার কয়েকটি হাওরে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণি মরে পানিতে ভেসে উঠছে। হাওর পাড়ের বাসিন্দারা সংগ্রহ করছেন ভেসে ওঠা মাছ। এছাড়া আধমরা ছোট-বড় মাছ জাল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে ধরছে।

মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বেশি পচা মাছ ও জলজপ্রাণিকে চিল, কাক খাচ্ছে এবং গরীব মানুষেরা কুড়িয়ে নিয়ে মরা মাছ শুকাচ্ছে। মাছের পচা দুর্গন্ধে পরিবেশ মারাত্মক দূষিত হচ্ছে। পানি কমতে শুরু করেছে। পাশাপাশি সাদা রঙয়ের পানি কালো রূপ ধারণ করছে।
বানিয়াহারী গ্রামের রহমত আলী জানান, পানির দুর্গন্ধে বাড়ি ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে।
হাটনাইয়া গ্রামের কবীর মিয়া জাগো নিউজকে জানান, সন্ধ্যার পর থেকে রাতভর লাইট জ্বালিয়ে যে যেভাবে পারছে বড় মাছ ধরছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাওরের মাছ মরে ভেসে উঠছে। হাওরের মিঠা পানির মাছের মধ্যে বোয়াল, আইড়, রুই, কাতলা, ইলিশ, পাবদা, মেনি, বাইম, গনিয়া এবং ছোট মাছের মধ্যে পুঁটি, চিংড়ি, চাপিলা, টেংরা, গোলশা মাছ ও মাছের লাখ লাখ রেনু পোনা মরে পানিতে ভেসে উঠছে।
দেখা গেছে- কাঁকড়া, বিষধর সাপ, শামুক, ঝিনুক মরে পানিতে ভাসছে। এ মধ্যে ডিমওয়ালা মা মাছের পরিমাণ বেশি।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটকে বিষয়টি অবগত করার পর প্রতিষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. খলিলুর রহমানসহ চারজনের এক মৎস্য গবেষক দল হাওর এলাকা পরিদর্শন করেন।

ময়মনসিংহ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. খলিলুর রহমান জাগো নিউজকে জানান, সম্প্রতি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া হাওরের আধাপাকা, কাঁচা, বোরো ধান পচে পানিতে অক্সিজেনের লেভেল দশমিক ১ পিপিএমের নিচে যা পাঁচ পিপিএমের ওপরে থাকার কথা ও অ্যামোনিয়ার মাত্রা বেড়ে শূন্য দশমিক ৫ ভাগে অতিক্রম করায় মাছ এবং জলজ প্রাণি মরে ভেসে উঠছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা দীলিপ কুমার সাহা জাগো নিউজকে জানান, গবেষক দল ডিঙ্গাপেতা হাওরে ভেসে উঠা মাছ ও হাওরের বিভিন্ন স্তরের পানির নমুনা সংগ্রহ করে প্যারামিটার পরীক্ষা করেন এবং তা আধুনিক পরীক্ষাগারে নিয়ে যান। এসব মরা মাছ খাওয়ার উপযোগী বলে তারা মত প্রকাশ করেন।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক ড. মুশফিকুর রহমান মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর বিভিন্ন হাওর ঘুরে জাগো নিউজকে জানান, বিশাল জলায়তনে মাছের মড়ক ঠেকাতে প্রতিষেধক প্রয়োগ করা হচ্ছে। যদিও বিশাল এই হাওরে অক্সিজেন দিয়ে মাছ রক্ষা করা কঠিন কাজ।
নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বছরে প্রায় সাতশ কোটি টাকার মাছ সারা দেশে রফতানি করা হয় বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ।
কামাল হোসাইন/এআরএ/আরআইপি