বিতর্কিত ওসি আলমগীরকে গোদাগাড়ী থানায় পোস্টিং


প্রকাশিত: ০১:৫৬ পিএম, ০৫ মে ২০১৫

রাজশাহীর তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা ও গ্রেফতার বাণিজ্যের অভিযোগে বহুল বিতর্কিত বোয়ালিয়া থানা পুলিশের সাবেক ওসি আলমগীরকে জেলার প্রধান থানা গোদাগাড়ীতে পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে।

এই ঘটনা জানাজানির পর রাজশাহীর সাংবাদিকদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ওসি আলমগীরকে পোস্টিং দেওয়ার খবরে গোদাগাড়ীর রাজনৈতিক মহলেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) আলমগীর কবীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ওসি আলমগীরকে সোমবার জেলায় বদলি করা হয়েছে। তাকে গোদাগাড়ী থানা পুলিশের ওসি হিসেবে বদলিরও সুপারিশ রয়েছে। এক দুদিনের মধ্যেই তাকে গোদাগাড়ীতে বদলি করা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে, রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) এলাকার সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী বিতর্কিত এই পুলিশ কর্মকর্তাকে তার থানায় পোস্টিং দেওয়ার খবরে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এসব হচ্ছে কি? যার বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ তিনি গোদাগাড়ীর মতো গুরুত্বপুর্ণ থানা চালাবেন কীভাবে? জানা গেছে, তিনি আলোচিত এই ওসিকে গোদাগাড়ীতে না দেওয়ার জন্য রাজশাহীর এসপিকে তার অভিমত জানিয়েছেন।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ এপ্রিল আরএমপির বোয়ালিয়া থানা থেকে ওসি আলমগীরকে রাজশাহী রেঞ্জে বদলি করে পুলিশ সদর দফতর। গত সোমবার বোয়ালিয়া থানা থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিনি রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজির অফিসে যোগদান করেন।

ওইদিন তাকে রাজশাহী জেলায় বদলি করেন রাজশাহীর রেঞ্জ ডিআইজি ইকবাল বাহার। জেলায় বদলি হয়েই ওসি আলমগীর রাজশাহী জেলা পুলিশে যোগদান করেন। ওসি আলমগীরের রাজশাহী জেলায় বদলির বিষয়টি প্রথমদিকে গোপন রাখা হয়।

এদিকে রাজশাহীর ডিআইজি মঙ্গলবার বিতর্কিত এই ওসিকে রাজশাহী জেলার প্রধান থানা গোদাগাড়ীর ওসি হিসেবে বদলির জন্য এসপিকে নির্দেশ দেন বলে পুলিশের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেন। বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত এই ওসিকে গোদাগাড়ীতে পোস্টিং দেওয়ার খবরে সাংবাদিকদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রাজশাহীর একজন সিনিয়র সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যার শাস্তি হওয়ার কথা তাকেই পুরস্কৃত করা হচ্ছে।

রাজশাহী জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, সোমবার জেলায় যোগদানের পর থেকে ওসি আলমগীরকে গোদাগাড়ীতে দেওয়ার জন্য ডিআইজি অব্যাহতভাবে চাপ দিচ্ছে এসপিকে। জেলা এসপি বিতর্কিত এই ওসিকে গোদাগাড়ীর মতো গুরুত্বপুর্ণ থানায় পোস্টিং দিতে না চাইলেও ডিআইজির চাপে শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বলে পুলিশের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকদের আন্দোলনের মুখে ওসি আলমগীরকে বোয়ালিয়া থানা থেকে সরানোর আগেই ডিআইজির সুপারিশে পুলিশ সদর দফতর তাকে রাজশাহী রেঞ্জে বদলি করেন।

রাজশাহীর সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অভিযোগে বলেন, ওসি আলমগীর বোয়ালিয়া থানায় গত তিন মাস ১৫ দিন দায়িত্ব পালনকালে শুধুমাত্র গ্রেফতার বাণিজ্য করেই কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেন।

এছাড়া মাদক ও নগরীর হোটেলগুলো থেকে প্রতিমাসে ২০ লাখ টাকা করে মাসোহারা তুলেছেন। সহিংসতায় জড়িত জামায়াত বিএনপির নেতাদের গ্রেফতার না করার শর্তে আদায় করেন বিপুল পরিমাণ টাকা।

এসব অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ করলে ওসি আলমগীর যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার ও রাজশাহী ব্যুরো প্রধান আনু মোস্তফা, দৈনিক প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক শহীদুল ইসলাম দুখু ও চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের ক্যামেরাপারসন রায়হানুল ইসলামের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলকভাবে গাড়ি পোড়ানো ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে মোট ৬টি ‘মিথ্যা’ মামলা দায়ের করেন। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকসহ রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ আন্দোলন শুরু করলে ওসি আলমগীরের বিরুদ্ধে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি।

সূত্রগুলো আরো জানায়, পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান আরএমপির উপকমিশনার দাঙ্গা শাহ গোলাম মাহমুদ মার্চের মাঝামাঝি ওসি আলমগীরসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্তে ওসি আলমগীরকে সাময়িক বরখাস্তসহ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করেন। কিন্তু, রহস্যজনক কারণে বিতর্কিত এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো নেয়া হয়নি বরং তাকে এক মাসেরও বেশি সময় রেখেই আরএমপি থেকে সরিয়ে রাজশাহী জেলায় বদলি করা হয়েছে।

ব্যাপক অভিযোগ থাকার পরও ওসি আলমগীরকে গোদাগাড়ীতে পোস্টিং দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) আলমগীর কবীর বলেন, সোমবার তাকে জেলায় বদলি করা হয়। তাকে গোদাগাড়ীতে দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সুপারিশ রয়েছে। তিনি সে আদেশ কার্যকর করতে বাধ্য।

ওসি আলমগীরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে ভালো থানায় পোস্টিং এর খবর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান। তিনি  বলেন, অভিযোগ প্রমাণের পরও তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক না নেওয়া রহস্যজনক। পুলিশের কোনো না কোনো ক্ষমতাবান কর্মকর্তার পৃষ্ঠপোষকতায় ওসি আলমগীর দায়িত্ব পালনে বেপরোয়া হয়ে উঠেন। পেশাদার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও আক্রোশমূলক মামলা করেও পার পেয়ে গেলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা সৃষ্টি হবে।

শাহরিয়ার অনতু/এমএএস/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।