দুই কর্মকর্তার মহতী উদ্যোগে ফরিদা পেল গোল্ডেন ৫
কষ্ট কাকে বলে তা জানতে হলে ফরিদার কাছে যেতে হবে। কারণ, ক্ষুধার কষ্ট কীভাবে চেপে রাখতে হয়, আর নানা আবদারে রিকশাচালক বাবাকে কেন মুখ লুকিয়ে কাঁদতে হয় ছোটবেলা থেকেই ফরিদা তা অনুভব করেছে।
আশপাশের স্বচ্ছল ঘরের মেয়েদের পাশে চলতে প্রথম দিকে সংকোচ হলেও ফরিদা দাঁত কামড়ে কষ্ট লুকাতো। বুকের ভেতরে আগুন- আর বাইরে হাসি রেখে সে পণ করেছিল, আমাকে পারতেই হবে। সেরাদের সেরা হতেই হবে। অবশেষে সেই সাফল্য তাকে ধরা দিল। যেমন তেমন নয়, এসএসসির ঘোষিত ফলাফলে গোল্ডেন জিপিএ হয়ে। এতদিন মুখে হাসি ছিল- আজ ফরিদার চোখে কান্নার নহর। কাঁদছেন ফরিদার বাবা ফরিদ আহম্মেদ বাকি মিয়া, মা ছামিনা বেগমও।
কিছুই ছিল না ফরিদাদের। এক ঘরে গাদাগাদি করে ঘুমোনো। পড়ার টেবিল ছিল না। তিন বেলা খাবার ছিল না। ঘুমানোর বিছানা ছিল না। ছিল শুধু স্বপ্ন। সাফল্যের আকাশে ডানা মেলার।
জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের জরমনদী গ্রামের রিকশাচালক ফরিদ আহম্মেদ বাকি ও গৃহিণী ছামিনা বেগমের এই মেয়েটি সুন্দরগঞ্জ আমিনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ফরিদা আক্তার এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলে বাকি মিয়ার। এর মধ্যে ফরিদা প্রথম, দ্বিতীয় ফারজানা ৭ম শ্রেণির ছাত্রী, ছেলে সাব্বির রহমান ৫ম শ্রেণির ছাত্র।
রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন বাকি। সবার ঠিকমত খাবার জুটতো না। ফরিদা জরমদনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ এবং আমিনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ অর্জন করার পর সবাই তার মেধার পরিচয় পান।
বাকি জানান, অষ্টম শ্রেণি পাড় হওয়ার পর ফরিদার লেখাপড়ার খরচ নিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। মেধাবী মেয়েটির জন্য ধর্না দেন নানাজনের কাছে। বেশিরভাগ লোকই তাকে ফিরিয়ে দেন। এসময় তাদের পাশে দাঁড়ান তৎকালীন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসাব হাবিব ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মাহমুদ হোসেন মন্ডল।
পড়ার টেবিল, ঘুমানোর খাট, বিনোদনের জন্য টিভি, বসার জন্য চেয়ার কিনে দেন নির্বাহী অফিসার আহসান হাবিব। কাগজ কলম, পাঠ্যবইসহ যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে থাকেন নির্বাহী ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দু’জনে মিলে । তাদের সহযোগিতায় ফরিদা অনেকটা নির্ভার হয়ে পড়তে শুরু করে। স্কুলের সময়, গোসলের সময়, ঘুমানোর সময় বাদে বাকি সময়ে পড়ার টেবিলে ছিল সে।
ফরিদা আক্তার জানালো, দুই স্যারের পাশাপাশি স্কুল আর কোচিং সেন্টারের স্যারদের সহযোগিতায় আজ সাফল্য তার হাতে ধরা দিয়েছে।
সে ভবিষ্যৎতে ডাক্তার হতে চায়। সে ভালো কোন একটি সরকারি কলেজ থেকে লেখাপড়া করে মেডিকেল সাইন্সে সাফল্য অর্জন করতে চায়। কিন্তু, আসল যুদ্ধটা কেবল শুরু হলো। কে নেবে তার এই স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব।
ফরিদ আহম্মেদ বাকি এখন মেয়ের সাফল্যে আবেগাপ্লুত। চোখভরা জল নিয়ে বললেন, আমি শরীরের রক্ত বিক্রি করে হলেও মেয়ের স্বপ্ন পুরণ করব।
এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষক মান্নান আকন্দ বললেন, এরকম মেধাবী মেয়ের লেখাপড়া অর্থের অভাবে থেমে গেলে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক।
এমএএস/আরআই