‘সিরিয়াল কিলার নান্নু’ অধ্যায়ের সমাপ্তি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ০৭:০৩ এএম, ২৮ আগস্ট ২০১৭

যশোরের আলোচিত ‘সিরিয়াল কিলার’ মোখলেছুর রহমান নান্নুর মরদেহ ভারতে উদ্ধার হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয় তিনি খুন হন বলে সূত্র জানিয়েছে।

নান্নুর মরদেহ উদ্ধার সংক্রান্ত সংবাদ গত শনি ও রোববার ভারতের আনন্দবাজারসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভারতীয় পুলিশ বনগাঁর চড়ুইগাছি এলাকার জিয়ালা খাল থেকে অর্ধগলিত একটি মৃতদেহ উদ্ধার করে। তবে মরদেহ উদ্ধারের তিনদিন আগেই ‘ভারতে নান্নু খুন হয়েছে’ বলে যশোরে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। মরদেহ উদ্ধারের পর নান্নুর স্ত্রী লাভলি ইয়াসমিন ভারতে গিয়ে মরদেহটি তার স্বামীর বলে শনাক্ত করেন।

নিহত মোখলেছুর রহমান নান্নু যশোর সদর উপজেলার শ্যামনগর গ্রামের সাইফুল ইসলাম সাফুর ছেলে। তার বিরুদ্ধে যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জিল্লুর রহমান মিন্টুসহ অন্তত ২০টি হত্যা মামলা রয়েছে। ২০১৬ সাল থেকেই নান্নু ভারতে পালিয়ে ছিল বলে সূত্র জানিয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও সূত্র জানিয়েছে, গত বুধবার দুপুরে বনগাঁর চড়ুইগাছি এলাকার জিয়ালা খালে পাট পচাতে গিয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি কচুরিপানার নিচে মৃতদেহটি দেখেছিলেন। এর এক দু’দিন আগেই সন্ত্রাসীরা তাকে হত্যা করে খালে কচুরিপানার মধ্যে মরদেহ রেখে যায়।

শুক্রবার মৃতদেহটি ভেসে ওঠে। এরপর স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। পরে অর্ধগলিত মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করে। শুক্রবার বিকেলে বনগাঁ মহকুমা হাসপাতাল মর্গে গিয়ে মোখলেছুর রহমান নান্নুর স্ত্রী মৃতদেহ শনাক্ত করেন।

তিনি বলেন, আমার স্বামীর বা পায়ের কড়ে আঙুল কাটা ছিল। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরও কড়ে আঙুল কাটা। মরদেহ শনাক্ত করে থানায় স্বামী হত্যার অভিযোগ করেছেন নান্নুর স্ত্রী লাভলী ইয়াসমিন।

তবে শুক্রবার মরদেহ উদ্ধার হলেও এর দু’তিন দিন আগে থেকেই নান্নু হত্যার গুঞ্জন যশোরে ছড়িয়ে পড়ে। এর সূত্র ধরেই নান্নুর স্ত্রী স্বামীর সন্ধানে পাসপোর্টে বৈধপথে ভারতে যান।

সূত্র আরও জানায়, ১৯৮৬ সালে যশোর শহরের রবীন্দ্রনাথ (আরএন) রোডে একটি আবাসিক হোটেলে বয়ের কাজ করতো মোখলেছুর রহমান নান্নু। সেখান থেকেই তার অপরাধ জগতে প্রবেশ। এক সময় হোটেলের কাজ ছেড়ে মাদক ব্যবসায় নেমে পড়ে নান্নু। আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হলে অল্প দিনের মধ্যে যশোর সদর উপজেলার শ্যামনগরের সর্বহারা দলের নেতা ইউনুস আলী ইনো ও কেরো নজরুলে বাহিনীতে যোগ দেন। শুরু হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডে যাত্রা।

তার দক্ষতায় সন্তুষ্ট হয়ে সর্বহারা দলের আরেক নেতা শরিফুল তার দলে ভেড়ান নান্নুতে। শরিফুল বাহিনীর প্রধান কিলার ও সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব পায় নান্নু। ৯৭ সালের দিকে পুলিশের হাতে শরিফুল নিহত হলে তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নান্নু’র হাতে চলে যায়।

শরিফুলের নাম মুছে দিয়ে বাহিনীর নাম হয় ‘মিয়া বাহিনী’। এলাকার ছিঁচকে সন্ত্রাসী, মাদকসেবী ও বিক্রেতারা যোগ দেয় মিয়া বাহিনীতে। ১৯৯৭ সালে ভাড়াটে খুনি হিসেবে আর্বিভূত হয় মোখলেচুর রহমান নান্নু। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার প্রভাব ও ব্যক্তি দ্বন্দ্বের জেরে তাকে হত্যা মিশনে ভাড়ায় যাওয়া শুরু হয় নান্নু ও তার বাহিনীর সদস্যদের।

সূত্র মতে, সিরিয়াল কিলার’ নান্নুর হাতে অন্তত ২০জন খুন হয়েছে বলে প্রচার রয়েছে। এরমধ্যে ছয়টি হত্যা মামলায় প্রধান আসামি নান্নু। আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে ২০১৬ সালের ৩১ সেপ্টেম্বর চৌগাছার পাশাপোল ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম, ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর চৌগাছার সিংহঝুলি ইউপি চেয়ারম্যান ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জিল্লুর রহমান মিন্টু, ২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সদস্য বাবু, একই সালের ২৯ মার্চ কাঠ ব্যবসায়ী বিএনপি কর্মী ইদ্রিস আলী হত্যাকাণ্ড।

ছয়টি হত্যা মামলায় নান্নু প্রধান আসামি। এছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে নান্নুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

এগুলো হলো- ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুরগাছা গ্রামের গুরুদাস, একই গ্রামের মিন্টু, বারোবাজার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রউফ, সুবর্ণসরা গ্রামের মোমিন, যশোর সদরের মথুরাপুর গ্রামে চকম আলী, ইছালি গ্রামের কোহিনুর, সাজিয়ালি গ্রামের আনিস, হাশিমপুর গ্রামের জয়নাল ও লিটু।

ভারতে নান্নুর মরদেহ উদ্ধারের পর উত্তর ২৪ পরগনার পুলিশ সুপার সি সুধাকর ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ‘খুনের মামলায় তদন্ত চলছে।’ তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে তাকে খুনের ‘সুপারি’ দেওয়া হয়েছিল সীমান্তের ওপার থেকে। দুষ্কৃতদের লাগিয়ে নান্নুকে খুন করা হয়।

পুলিশ জানতে পেরেছে, খুনের রাতে নান্নুর সঙ্গেই ছিল শোহারব। বনগাঁর বোয়ালদহ গ্রামে শোহারব মন্ডলের বাড়িতে দেড়বছর ধরে ভাড়া থাকতো মোখলেছুর রহমান নান্নু। ওই গ্রামে জমি কিনে বাড়িও করেছে নান্নু। পঞ্চায়েতের অনুমতি ছাড়া জমি কেনা গেলেও বাড়ি করতে অনুমতি লাগে। তবে নান্নুর বাড়ি তৈরির জন্য পঞ্চায়েত থেকে কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি বলেই দাবি করেছেন স্থানীয় ঘাটবাওর পঞ্চায়েতের প্রধান জেসমিন আরা খাতুন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মাস তিনেক আগে জমি কিনে বাড়ি তৈরি শুরু করে নান্নু। মাঝে মধ্যে এখানেই থাকতো সে। কয়েক দিনের মধ্যে পাকাপাকি ভাবে বাড়িতে উঠে আসার কথা ছিল।

মিলন রহমান/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।