বাবাকে আটকে রেখে ছেলেকে হত্যার অভিযোগ
নগরীর গল্লামারী এলাকায় একদল সন্ত্রাসী কর্তৃক ধারালো অস্ত্র দিয়ে যুবলীগ কর্মী সজিবকে হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি আরমান খাঁ (২০) কে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। শুক্রবার গভীর রাতে লবণচরায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার পুলিশ। তবে হত্যা মামলার প্রধান আসামি হাফিজকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
রোববার দুপুরে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত যুবলীগ কর্মী ইমরান সজিব আকনের বাবা নজরুল ইসলাম আকন। তিনি বলেন, ‘আমার সজিবকে শুধু কুপিয়ে ক্ষান্ত হয়নি পাষণ্ডরা। কুপিয়ে তার শরীর থেকে হাত বিচ্ছিন্ন করে তা দিয়ে নিজেদের মধ্যে ‘ক্যাচ’ ধরাধরি খেলেছে। প্রকাশ্যে রাস্তায় কাটা হাত নিয়ে উল্লাস করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে খালের মধ্যে।
এ হত্যাকাণ্ডে আবারো উঠে এসেছে খুলনার এক সময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী হাফিজুর রহমান হাফিজের নাম। শুক্রবার রাতে নিহত সজিবের বাবা নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে হাফিজকে প্রধান আসামি ও তার ৯ সহযোগীর বিরুদ্ধে নগরীর লবণচরা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। রোববার বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ সন্ত্রাসী হাফিজকে গ্রেফতার করতে পারেনি বলে জানা গেছে।
রোববার সজিবের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে শোকের মাতম। ছেলে হারা মা শাহনাজ বেগমের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। দুই বছর বয়সী সজিবের একমাত্র ছেলে রোহানকে কোলে নিয়ে নিথরভাবে বসেছিলেন স্ত্রী শারমীন।
শাহনাজ বেগম জানান, হাফিজ তার ছেলেকে দলে ভেড়াতে অনেক আগে থেকে চেষ্টা করছিল। কিন্তু সজিব হাফিজকে পচ্ছন্দ করতো না। এজন্য হাফিজের লোকজন তাদের গেট কুপিয়ে গেছে। সজিব সব সময় বলতো হাফিজ তাকে মেরে ফেলতে পারে।
তিনি জানান, শুক্রবার সকালে তার স্বামীকে হাফিজ ফোন করে ডেকে নিয়ে যায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সজিবকে কারা ফোন করে জানায়, সাচিবুনিয়ায় তার মাছের ঘেরে হামলা করেছে। সজিব দ্রুত মোটরসাইকেল নিয়ে ঘটনাস্থলে যেতেই হাফিজের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা তাকে ঘিরে ফেলে এবং তাকে এমনভাবে কুপিয়েছে যে, তার শরীরে সেলাই করা যায়নি। সন্ত্রাসীর তার একটি কাটা হাত নিয়ে ক্যাচ ধরাধরি করে রাস্তায় উল্লাস করেছে।
সজিবের বাবা নজরুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি সাচিবুনিয়ায় একটি জমি কিনে প্লট আকারে বিক্রির উদ্যোগ নেন তিনি। বৃহস্পতিবার ওই জমিতে রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে হাফিজের লোকজন এসে বাধা দেয়। কাজ করতে হলে হাফিজকে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে বলে তারা হুমকি দেয়। এ নিয়ে হাফিজের সাথে তার বিরোধ চলছিল। কিন্তু হাফিজ যে তার ছেলেকে মেরে ফেলবে সেটা তিনি ভাবতে পারনেনি।
এদিকে শুক্রবার রাতে এস এম হাফিজুর রহমান হাফিজকে প্রধান আসামি করে নগরীর লবণচরা থানায় নিহত সজিবের বাবা নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার অপর আসামিরা হলেন, মাহবুব, চঞ্চল, ভাগ্নে সুমন, সজল, জামাই মনির, সিরাজ, তানজির রহমান ওসান, ন্যাটা বাবু ও আরমানসহ অজ্ঞাতনামা ১৫-২০জন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সাচিবুনিয়া এলাকায় তার জমিতে কাজ করতে গেলে হাফিজের লোকজন বাধা দেয়। পরে জমির কাগজপত্র নিয়ে শুক্রবার হাফিজের গল্লামারীস্থ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের অফিসে যেতে বলে। শুক্রবার বেলা ১১টায় আবারো তাকে ফোন করে ডেকে নিয়ে হাফিজের গল্লামারী অফিসে বসিয়ে রাখে। কিছু সময় পরই এলাকার লোকজন জানায় যে, তার ছেলেকে কারা কুপিয়ে ফেলে রেখেছে। এ খবর পেয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে লবণচরা থানার ওসিকে ফোন করে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যেতেই দেখেন মাহবুব, চঞ্চল, ভাগ্নে সুমন, সজল, জামাই মনির, সিরাজ, ওসান ও ন্যাটা বাবু রাম দা, চাইনজ কুঠাল, চাপাতি নিয়ে উল্লাস করতে করতে যাচ্ছে।
এজাহারে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, তার বড় ছেলে মিজান ও অন্যান্যরা সজিবকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালের নেওয়ার সময় সজিব জানায়, মাহবুব ও চঞ্চল চেপে ধরে এবং ভাগ্নে সুমন তার মাথার পেছনে কোপ মারে ও হাত কেটে ফেলে। সিরাজসহ অন্যরা সারা শরীরে কোপায়।
সজিবের বাবা জানান, সন্ত্রাসী হলেও হাফিজ ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকে। যুবলীগের বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হাফিজ। এছাড়া আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গে সে চলাফেরা করে। মামলার পরেও হাফিজ তাকে জীবননাশের হুমকি দিচ্ছে। তিনি বলেন, হাফিজ মোটা অংকের টাকা নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতা ও পুলিশ প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
এ ব্যাপারে লবণচরা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরদার মোশারফ হোসেন জানান, এজাহারভুক্ত আসামি আরমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এ মামলার প্রধান আসামি হাফিজকে গ্রেফতারের ব্যাপারে রাজনৈতিক কোন চাপ নেই বলে তিনি জানান। আসামি হাফিজ খুলনায় নেই বলেও জানান।
এ ব্যাপারে হাফিজের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “সজিব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। আমার রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবমূর্তি নষ্ট করতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে। বাদী নজরুল ও তারা ছেলে সজিব এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও হত্যা মামলার আসামি। নজরুলের সঙ্গে আমার জমি নিয়ে কোন বিরোধ নেই। অন্য কারোর বিরোধ থাকতে পারে বলে তিনি জানান।
আলমগীর হান্নান/এসএস/আরআইপি