শাজনীন হত্যা : আসামি শহীদুলের ফাঁসি কার্যকর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি গাজীপুর
প্রকাশিত: ০৪:১৫ পিএম, ২৯ নভেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০৫:২১ পিএম, ২৯ নভেম্বর ২০১৭
শাজনীন হত্যা : আসামি শহীদুলের ফাঁসি কার্যকর

রাজধানীর গুলশানের নিজ বাড়িতে শিল্পপতি লতিফুর রহমানের মেয়ে শাজনীন তাসনিম রহমানকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

বুধবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে গাজীপুরে কাশিমপুর হাইকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। তিনি ২০১২ সাল থেকে এ কারাগারে বন্দি ছিলেন। রায় কার্যকরের পর কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. মিজানুর রহমান কারা ফটকে এসে সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, ফাঁসি কার্যকরের পর সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার ভাই মহিদুল ইসলাম মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে রাতেই তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মোকসেদপুর থানার ডাংগাদুর্গাপুর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে শাজনীন হত্যা মামলার আসামি শহীদুল ইসলাম শহীদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন।

কারাসূত্র জানায়, ফাঁসির রায় কার্যকরের সময় গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাহেনুল ইসলাম, কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মো: মঞ্জুুরুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল শেখ উপস্থিত ছিলেন।

ফাঁসি কার্যকরের সময় লিভার টেনে ধরেন কারাগারের প্রধান জল্লাদ রাজু। এসময় তার কয়েক সহযোগী উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বুধবার দুপুরে শহীদের পিতা সিদ্দিক মোল্লা, মা, ভাই, বোন কারাগারে তার সঙ্গে শেষ দেখা করেন।

কারাসূত্র জানায়, সাক্ষাৎকালে শহীদ স্বাভাবিক থাকলেও তার বাবা-মা ও ভাই বোন কান্নায় ভেঙে পড়েন। এক পর্যায়ে শহীদও আবেগে আপ্লুত হয়ে যান। অশ্রুস্বজল চোখে তারা কারাগার ত্যাগ করেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে গুলশানে নিজ বাড়িতে খুন হন শাজনীন তাসনিম রহমান। পরদিন শাজনীনের বাবা লতিফুর রহমান গুলশান থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ওই ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলা করে সিআইডি। তদন্ত শেষে প্রথম মামলায় ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১ এবং দ্বিতীয় মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। দুটি মামলাতেই আদালত অভিযোগ গঠন করেন। পরে দুটি মামলারই অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন আসামিরা।

১৯৯৯ সালের ৬ জুলাই বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল করিম ও বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের (পরে প্রধান বিচারপতি) সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়ে বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজের আদালতে বিচারাধীন হত্যা মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। কারণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে ইতোমধ্যে আসামিদের খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে বিচারাধীন ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটির কার্যক্রম চলবে। ওই রায়ে হাইকোর্ট বলেন, ধর্ষণ ও হত্যা দুটি পৃথক অপরাধ, একটি আরেকটি থেকে আলাদা।

এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল বিভাগে যান। ১৯৯৯ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল, বিচারপতি লতিফুর রহমান (পরে প্রধান বিচারপতি), বিচারপতি এ এম মাহমুদুর রহমান ও বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর (পরে প্রধান বিচারপতি) সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগের বেঞ্চ আসামিদের আপিল আবেদন খারিজ করে দেন।

সর্বোচ্চ আদালত রায়ে বলেন, হাইকোর্ট সঠিকভাবেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে চলা মামলাটির কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দিয়ে অন্য মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বলেছেন। এটা এমন একটি মামলা, যেখানে ধর্ষণের সময় হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। বরং স্পষ্টত এখানে প্রথমে ধর্ষণ ও পরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ধর্ষণ ও হত্যা দুটি আলাদা অপরাধ এবং এ ক্ষেত্রে একই অপরাধে দুবার বিচার হওয়ার ঘটনা ঘটবে না।

সর্বোচ্চ আদালত থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মামলাটির বিচার চলতে থাকে। ২০০৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের বিচারক কাজী রহমতউল্লাহ মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শাজনীনকে ধর্ষণ ও খুনের পরিকল্পনা এবং সহযোগিতার দায়ে ছয় আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য মামলাটি হাইকোর্টে যায়। একই সঙ্গে আসামিরাও আপিল করেন। ২০০৬ সালের ১০ জুলাই হাইকোর্ট পাঁচ আসামি হাসান, শহীদ, বাদল, মিনু ও পারভীনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন।

এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভ টু আপিল) করেন চার আসামি হাসান, বাদল, মিনু ও পারভীন। ২০০৯ সালের ২৬ এপ্রিল সাজাপ্রাপ্ত চার আসামির লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ। ফাঁসির আদেশ পাওয়া আরেক আসামি শহীদ জেল আপিল করেন। ১১ এপ্রিল ওই আপিল শুনানি শেষ হয়।

পরে আদালত শাজনীন তাসনিম রহমানকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় গৃহভৃত্য শহীদুল ইসলামের (শহীদ) মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে অন্য চারজনকে খালাস প্রদান করেন। ২০১৬ সালের ২ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এ রায় দেন। খালাস পাওয়া চারজন হলেন বাড়ির সংস্কারকাজের দায়িত্ব পালনকারী ঠিকাদার সৈয়দ সাজ্জাদ মইনুদ্দিন হাসান ও তার সহকারী বাদল, বাড়ির গৃহপরিচারিকা দুই বোন এস্তেমা খাতুন (মিনু) ও পারভীন।

মো. আমিনুল ইসলাম/এআর/বিএ