১৪ বছর পর কারামুক্তি, স্বজনদের খুঁজছেন দুই নারী

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ১১:২৮ এএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৭

বরকতী বিবি। বাবার নাম কালা হাফেজা। বয়স আনুমানিক ৪৫। ঠিকানা অজ্ঞাত। অপরজন রাশিদা বেগম। বাবার নাম আলিম। বয়স আনুমানিক ৫৫। ঠিকানা অজ্ঞাত। এসব হয়তো এদের সঠিক নাম নয়। যে কোনোভাবে পুলিশের খাতায় বা বিচারের নথিতে লেখা পড়েছে এসব নাম।

রোববার বিকেলে এরা সাতক্ষীরা জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। কারা কর্তৃপক্ষের কাছে তারা দুইজনই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। কারাগার থেকে মুক্তির পর সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার তারালী ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।

সাতক্ষীরা কারাগার সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালের ৩১ মে সাতক্ষীরার তালা থানার একটি শিশু অপহরণ মামলায় বরকতী ও রাশিদাকে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ। এ সময় তারা তাদের নাম ও ঠিকানা সঠিক করে বলতে পারেননি।

পরবর্তীতে পুলিশ ওই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০০৭ সালের ২৮ জুন সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক তাদের প্রত্যেককে ১৪ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। বিচারক ওই দুই নারীর হাজতবাসের সময়কাল সাজার সঙ্গে যুক্ত করেননি। এরপর থেকে তারা কয়েদি হিসেবে সাতক্ষীরা কারাগারে ছিলেন।

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের চম্পাফুল ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হোসেন ছোট জানান, তার ইউনিয়নের দুইজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী দীর্ঘদিন জেল খানায় রয়েছেন বলে এক মাস আগে তাকে অবহিত করেন সাতক্ষীরা জেলার তুহিন কান্তি খাঁন।

তারা নিজেদের নাম ঠিকানা বলতে পারেন না। তাই তাদেরকে একবার দেখতে আসার জন্য তাকে বলা হয়। দুইদিন পর কারা ফটকে গিয়ে ওই দুইজনের সঙ্গে দেখা হয়। তবে চিনতে পারেননি তিনি।

এ সময় দুইজনকে কোনো উপায়ে পুনর্বাসন করা যায় কি-না এ জন্য জেলার সহযোগিতা চান। কারা সুপার আবু জাহেদ ও জেলার তুহিন কান্তি খান বলেন, আপনি চলে গেলে এদের মুক্তি পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

চেয়ারম্যান এনামুল হোসেন ছোট বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের কথা শুনে তিনি ওই দুই নারীকে পুনর্বাসনের দায়িত্ব দেন। কথা বলেন তার পরিষদের নারী ও পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে। সেখানে তিনি যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার ইউনিয়নের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের থাকার জন্য বরেয়ার গুচ্ছগ্রামের দুইটি ঘরসহ স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও কমপক্ষে একটি বছরের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সেখানে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন।

এরই অংশ হিসেবে কারা ফটকের মধ্যে তাদের দুইটি নতুন শাড়ি পরানো হয়। যদিও দীর্ঘ কারাবাসের সময় সালোয়ার কামিজ পরায় নতুন করে কাপড় পরার অভ্যাসটা তাদের কাছে নতুন বলে মনে হচ্ছিল।

এদিকে, বরকতী ও রাশিদাকে কালিগঞ্জের চম্পাফুল ইউনিয়নের বরেয়া গুচ্ছগ্রামে নিয়ে যাওয়ার পর গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারাই তাদের রান্না খাবার খাইয়েছেন। সবার সঙ্গে মিশতে পেরে তারা খুশি। গুচ্ছগ্রামকে তারা নিজের বাড়ি হিসেবে মেনে নিয়েছে। এরপরও স্বজনদের না পাওয়ার বেদনা তাদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে।

সাতক্ষীরা কারাগারের সুপার আবু জাহেদ ও জেলার তুহিন কান্তি খান জানান, ১৪ বছর সাজার মধ্যে বরকতী ও রাশিদা প্রত্যেককে ৬২৭ দিন কারা আইন অনুযায়ী ছুটিসহ (রিয়াদ) ১২ বছর ছয় মাস এক দিন কারাভোগ করেছেন। বিচারের রায় ঘোষণার আগে তারা প্রায় দুই বছর জেলহাজতে ছিলেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রইব্যুনালে তাদের প্রত্যেককে ১৪ বছর করে কারাদণ্ড দিলেও হাজতির মেয়াদ কারাদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ ছিল না।

দুইজন বুদ্ধি অথবা মানসিকপ্রতিবন্ধী নারীকে একটি ঠিকানা খুঁজে দিতে পেরে তারা আনন্দিত। মুক্তির সময় ওই দুই নারীকে এক হাজার করে টাকা দেয়া হয়। ওই দুই নারী কালিগঞ্জের বরেয়া গুচ্ছগ্রামে কিভাবে থাকছে তা তারা প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখবেন। এছাড়া সঠিক পরিচয় খুঁজে পেতে সাংবাদিকসহ সবার সহযোগিতা কামনা করেন কারা কর্তৃপক্ষ।

আকরামুল ইসলাম/এএম/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।