ক্ষুধার্ত পেটে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন রাজ্জাক

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক রংপুর
প্রকাশিত: ১০:৩১ এএম, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

১৯৭১ সাল। বয়স ১৮ কিংবা ১৯। বাড়ির বড় ছেলে হয়েও তখন পরিবার-পরিজন আর সংসারের চেয়ে দেশটাই যেন অনেক বড় কিছু ছিল তার কাছে। জ্বালাও-পোড়াও, মানুষ হত্যা, বোনের সম্ভ্রমহানির প্রতিনিয়ত খবরে অস্থির হয়ে উঠেন আব্দুর রাজ্জাক।

দিনমজুর বাবা আব্দুর রহিমের কাছে অনুমতি নিয়ে চলে যান ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে। প্রায় এক মাস সেখানে প্রশিক্ষণ শেষে পঞ্চগড়ের চিলাহাটি, দেবীগঞ্জ, নীলফামারীর ডোমার-ডিমলাসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন।

কখনও একবেলা ভাত জুটলেও কখনও না খেয়ে আবার কখনওবা রুটি খেয়েই দিন পার করতে হয়েছে। ক্ষুধার্ত পেটে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন পাক হানাদারদের আস্তানায় হানা দিতে। পেটের ক্ষুধার চেয়ে যেন বড় ক্ষুধা ছিল একটি স্বাধীন বাংলাদেশের, একটি স্বাধীন পতাকার ক্ষুধা। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত শরীরেও যেন স্বপ্ন ছিল একটি স্বাধীন দেশ।

দেশ স্বাধীন হয়েছে। লাল সবুজের পতাকা পেয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের একজন কারিগর হয়েও নিজের ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে গিয়ে তিনি হয়েছিলেন নৈশপ্রহরী। রাতের পর রাত জেগেছেন। স্বাধীনতা বিরোধীরা এ দেশ থেকে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত দেশে শান্তি আসবে না-এই ভেবে আজও জেগে থাকেন।

মুক্তিযুদ্ধ আর জীবনযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে জাগো নিউজের কাছে এভাবেই আবেগ-অনুভূতি তুলে ধরেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক।

আব্দুর রাজ্জাক জানান, দেশ স্বাধীনের পর ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ বেছে নেন। এরপর রংপুর শিল্পকলা একাডেমিতে নৈশপ্রহরীর চাকরি হয় তার। স্ত্রী, ৬ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে দিনের সময়টাতে রংপুর টাউনহলে আলোকসজ্জার কাজ আর রাতে নৈশপ্রহরীর চাকরি করেন।

দুর্ঘটনায় এক ছেলে ও একমাত্র মেয়েকে হারানোর পর টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে ক্যান্সারে আক্রান্ত আরও এক ছেলেকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন।

fredom

মুক্তিযুদ্ধের এ বীরসেনা জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে একটা সময় হাঁফিয়ে উঠেন। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়ে আট বছর আগে চাকরি ছেড়ে দেন। বড় ছেলে আলমগীর এখন তার বাবার পেশাটাই আগলে ধরে দিনরাত কাজ করছেন। বাকি তিন ছেলের মধ্যে সবার ছোট টুটুল অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। অন্য দুই ছেলের একজন জেলা প্রশাকের কার্যালয়ে এবং অন্যজন গঙ্গাচড়ার একটি ইউনিয়নের ভূমি অফিসে অফিস সহকারী পদে কাজ করছেন।

আব্দুর রাজ্জাক জানান, নগরীর শালবনে পৈত্রিক নিবাস থাকলেও তা এখন আর নেই। গঙ্গাচড়ার বড়বিল ইউনিয়নের পানাপুকুর গ্রামে স্ত্রীর পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া একখণ্ড জমিতে মাথা গোজার ঠাঁই মিললেও তিনি থাকেন শহরেই। গোমস্তাপাড়া সংলগ্ন শ্যামা-সুন্দরী খালের উপর খাস জমিতে ছাপড়ি ঘর তুলে কোনো রকমে রাতটা কাটিয়ে দেন। আর দিনের সময়টা কাটে চিরচেনা টাউনহল চত্বরে অথবা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবনে। সুযোগ বুঝে ছুটেও যান পানাপুকুর গ্রামে স্ত্রী, ছেলে ও অন্য স্বজনদের কাছে।

দেশ স্বাধীন হবে কবে, আর স্বাধীন হলেও প্রিয়জনের মুখটা আর কখনও দেখা হবে কীনা, এরকম লাখো অনিশ্চয়তার মধ্যে সবাইকে এক সুরে বেঁধে রেখেছিলো যে অনবদ্য দেশাত্মবোধক গান-‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি’ ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ এমন অসংখ্য গান শুনলে আজও অস্থির হয়ে উঠেন তিনি।

নগরীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রাণকেদ্র স্মৃতি বিজরিত টাউন হল, শিল্পকলা একাডেমি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘিরে তাই আজও আটকে আছে মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাকের মন-প্রাণ।

সরকারিভাবে পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং ছেলেদের কর্মসংস্থান হওয়ায় শেষ জীবনে কিছুটা শান্তির দেখা মিললেও দেশের অশান্তি দেখলে এখনও রাতে ঘুমাতে পারেন না।

স্বাধীনতা বিরোধীরা এ দেশ থেকে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত দেশে শান্তি আসবে না বলে মনে করেন তিনি। তাদের নিশ্চিহ্ন করতে প্রয়োজনে আরও একবার যুদ্ধ করতে চান আব্দুর রাজ্জাক।

মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সদরুল আলম দুলু বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক জীবনযুদ্ধেও সংগ্রামী ছিলেন। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে ছেলেদের পড়ালেখা করাতে পারেন নি। জেলা ও মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবসময় চেষ্টা করেছি।

জিতু কবীর/এমএএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।