মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেলে মরেও শান্তি পেতাম
দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছিলেন পাবনার মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলী খান। কিন্তু দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি তিনি। বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রীসহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। তার স্বপক্ষে বিভিন্ন কাগজপত্র ও তথ্য প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি দেখে যেতে চান তার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।
মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলী খানের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, পাবনা সদর উপজেলার দক্ষিণ মাছিমপুর (দিয়ার রাজাপুর) গ্রামের মৃত রায়হান উদ্দিন খান ও মৃত রুপজান বেগমের ছেলে ইদ্রিস আলী খান। তার জন্ম তারিখ ০২-০৩-১৯৪৫ ইং। সে হিসেবে তার বর্তমান বয়স ৭৩ বছর। আর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ২৬ বছর। যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগে রাজশাহীতে (ইপিপি আর) রিজার্ভ পুলিশে কর্মরত ছিলেন ইদ্রিস আলী খান। যার কং নং ১৪২৭।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি রাজশাহী পুলিশ লাইনে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চে রাজশাহী পুলিশ লাইনে চারদিক বাংকার করে অন্যদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন তিনি। ২৫ মার্চ তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে পাক বাহিনী। ওই সময় ইদ্রিস আলী খানের সহযোদ্ধা ছিলেন সাদেকুল ইসলাম ও আজিজ মোল্লা। তাদের বাড়িও পাবনায়। পাকসেনারা যখন শেল ছোড়ে তখন শেলটা তাদের মোর্চার মধ্যে গিয়ে পড়ে।। তাতে সাদেকুল ও আজিজ মারা যান। সেই যুদ্ধে মোট ১৯ জন শহীদ হন। তাদের নাম রাজশাহী পুলিশ লাইনের শহীদ মিনারে লেখা আছে। এরপর ইদ্রিস আলী খানসহ অন্যারা রাজশাহী পুলিশ লাইন পার হয়ে পদ্মায় চলে যান।
সে সময় তার সহযোদ্ধা ছিলেন রাজশাহীর নুরুল ইসলাম, পাবনার চাটমোহরের জবান আলী। সে সময় এসপি ছিলেন আব্দুল মজিদ। ডিআইজি ছিলেন মামুন। পুলিশ লাইনের আরআই ছিলেন রাজশাহীর রাজপাড়ার রইস উদ্দিন। পদ্মার চর থেকে সমবেত হয়ে বিডিআর ও পুলিশ মিলে পুনরায় পাক সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন ইদ্রিস আলীসহ অন্যান্যরা।
সে সময় তার সহযোদ্ধা ছিলেন পাবনার বনগ্রামের ইয়াকুব হোসেন ও রাজশাজীর সহ-দারোগা রবি চন্দ্র দাস ও রাজশাহীর জুম্মন আলী। যুদ্ধ চলাকালে এসপি আব্দুল মজিদ ও ডিআইজি মামুনকে পাকসেনারা হত্যা করে। তারপর পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে রাজশাহীকে মুক্ত করেছিলেন। তার কিছুদিন পর নগরবাড়ি পার হয়ে বহু পাকসেনারা রাজশাহী বানেশ্বর বেলপুকুরে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ করে। সে যুদ্ধে কিছু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইদ্রিস আলী খানসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা রাজশাহী পুলিশ লাইনে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন। তখন নায়েক হাবিলদার পদে প্রমোশন হয় ইদ্রিস আলী খানের। সে সময় রাজশাহী আরআরএফ থেকে এসএফ পুলিশ লাইন রাজশাহীতে বদলি হন তিনি। ৭ নং সেক্টরে আরআই রইস উদ্দিনের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি। যুদ্ধের পর রাজশাহী অস্ত্রাগারে থ্রি নট থ্রি রাইফেল জমা দিয়েছিলেন।এরপর ১৯৭৫ সালে মুক্তিবাহিনীর টিম ঢাকা থেকে রাজশাহী গিয়ে ইদ্রিস আলীর জবানবন্দি নিয়ে আসে। রাজশাহীতে কোথায় কীভাবে যুদ্ধ করেছেন তার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে নিয়ে যান তারা।
তবুও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি ইদ্রিস আলী খান। এর মধ্যে ২০০২ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসরে যান তিনি। শেষবারের মতো যখন মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তির আবেদন চাওয়া হয়েছিল, তখন অনলাইনে ফরম পূরণ করে আবেদন করেছিলেন ইদ্রিস আলী খান। এছাড়া ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পাবনা সদর উপজেলায় প্রকৃতি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক গণবিজ্ঞপ্তি জারির পর সেখানেও হাজির হয়ে কাগজপত্র দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ৩৫৪১ আরও ১৫/০৫/২০১৭ নং স্মারকে রাজশাহী পুলিশ দফতরের মাধ্যমে একটি আবেদন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তার নাম আসেনি।
বর্তমানে বয়সের ভারে অসুস্থ হয়ে ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না ইদ্রিস আলী। তার চার মেয়ে ও এক ছেলে। সখিনা খাতুন, আলেয়া খাতুন, তাহমিনা খাতুন, রোকসানা খানম ও আলী আকবর খান। প্রথম তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম, ছোট মেয়ে রোকসানা খানম ও একমাত্র ছেলে আলী আকবর খানকে নিয়ে চলছে তার সংসার।
ইদ্রিস আলী খান বলেন, নিজের জীবন বিপন্ন করে দেশ স্বাধীন করতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। দেশ স্বাধীনের পর পুনরায় রাজশাহী পুলিশ লাইনে পুলিশ বাহিনীতে যোগদানের পর যুদ্ধকালীন ৯ মাসের বেতনও একসঙ্গে পেয়েছিলাম। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় বড় কষ্টে দিনাতিপাত করছি।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার বর্তমানে ক্ষমতায় আসার পর অনেককেই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে নিয়মিত ভাতা প্রদান করছে। অথচ আমি ও আমার সন্তানরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দফতরে ঘুরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে আবেদন নিবেদন করে আজও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলাম না। জীবনের শেষ প্রান্তে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেলে মরেও শান্তি পেতাম।
একে জামান/আরএআর/পিআর