বিদ্যুৎ সংযোগের নামে টাকা খান এমপির ভাই

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ১২:১৬ পিএম, ৩১ মে ২০১৮

 

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার নামে ইপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ বদরুল এলাকাবাসীর কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় মেম্বার ও কয়েকজন সরকার দলীয় নেতাসহ সিন্ডিকেট করে ২০১৫ সাল থেকে দফায় দফায় এই টাকা আদায় করেন তিনি। কিন্তু এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়নি। অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ সাবেক চিপ হুইপ ও বর্তমান সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদের ছোট ভাই।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়ার জন্য টাকা প্রদান করেছেন এমন পাঁচজন ব্যক্তি এলাকাবাসীর পক্ষে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিরি জেনারেল ম্যানেজার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।

বড়চেগ গ্রামের মসুদ আলী, মাসুক মিয়া, মো. আসাদ, আমির হোসেন ও জোবায়ের আহমদ অভিযোগে জানান, বিদ্যুতায়নের দ্বিতীয় দফায় বড়চেগ এলাকার মানুষের কাছ থেকে স্থানীয় ওয়ার্ডের সদস্য মাহমুদ আলী ও আওয়ামী লীগ নেতা সুলেমান মিয়া ২৭ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছেন। প্রত্যেক গ্রাহকের কাছ থেকে সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক প্রবাসী পরিবারের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। এমনকি টাকা দিতে পারেনি গ্রামের এমন ৮০টি পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগের বাইরে রাখা হয়েছে।

এই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে কিছুদিন আগে স্থানীয় দুই সংবাদ কর্মীকে ইউপি সদস্য মাহমুদ আলী ও তার লোকজন কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখেন ও প্রাণনাশের হুমকি দেন। ওই ঘটনায় কমলগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছেন এক গণমাধ্যম কর্মী।

সরেজমিনে গেলে গ্রাহকরা জানান, প্রধানমন্ত্রীর শতভাগ বিদ্যুতায়ন সিদ্ধান্তের আওতায় রহিমপুর ইউনিয়নের বড়চেগ গ্রামে গত বছরের শেষ দিকে প্রথম দফায় ৫ কিলোমিটার ও দ্বিতীয় দফায় সাড়ে চার কিলোমিটার বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু হয়। মোট ৫৬৬ জন গ্রাহকের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিমাণের অর্থ আদায় করা হয়।

এলাকাবাসী জানান, ইফতেখার আহমেদের পক্ষে ওয়ার্ড সদস্য মাহমুদ আলী, সুলেমান মিয়া, জয়নাল মিয়া, মিন্নত আলী এ চাঁদা আদায় করছেন। পল্লী বিদ্যুতের পরিচালক মো. আব্দুল আহাদও এই প্রক্রিয়ায় জড়িত বলে অভিযোগ তাদের।

বড়চেগ গ্রামের হাদিস মিয়া জানান, দুইটি মিটারের জন্য তিনি ১৪ হাজার টাকা দিয়েছেন। টাকা না দিলে বিদ্যুৎ মেলে না এই ভয়ে তিনি টাকা দিয়েছেন কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বাড়িতে খুঁটি যায়নি। আদৌ পাবেন কিনা তা নিয়ে সন্দিহান তিনি।

গ্রামের মো. খিজির মিয়া বলেন, আমার কাছ থেকে ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়েছে। এটা সরকারি বিদ্যুৎ তা বুঝতে পারিনি তাই টাকাগুলো দিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহমুদ আলী নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে বলেন, শুনেছি জয়নাল মিয়া ও সুলেমান মিয়া বিদ্যুৎ নিয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করছে। এলাকায় কাকে বিদ্যুৎ দেয়া যায় আর কাকে দেয়া যায় না সেটা তারাই ঠিক করে। আর চাঁদা নয় মিটার সিকিউরিটির টাকা দিচ্ছেন গ্রাহকরা।

অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ বদরুল বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট। তবে মিটার সিকিউরিটির জন্য যে টাকা তোলা হয়েছে তা অবশ্যই জমা দেয়া হয়েছে।

বড়চেগ গ্রামের মানুষের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ টাকা পয়সা নিলে আমার কাছে অভিযোগ করবে কিন্তু কেউ করেনি। তবে আমরা অনেক সময় শুনি যারা কাজ করে ঠিকাদার কন্ট্রাক্টরের লোকজন তারা খাওয়া-দাওয়ার জন্য হয়তো এদিক সেদিক বলতে পারে। এ জন্য কেউ টাকা পয়সা দিয়ে থাকলে সেটা অন্য জিনিস।

বাংলাদেশ পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাজাঙ্গীর আলম জানান, ঠিকাদাররা কোনোপ্রকার আর্থিক লেনদেন করতে পারেন না। কারো বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ উঠলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

মৌলভীবাজার পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী শিবু লাল বসু বলেন, আমাদের স্পষ্ঠ কথা এই বিদ্যুৎ বিনা খরচে সরকার দিচ্ছে। তবে কিছু কিছু এলাকায় অর্থ নেয়ার অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে আমরা ব্যবস্থাও নিচ্ছি। এসব দুর্নীতি একেবারে শেকড়ে চলে গেছে। এখান থেকে উপড়ে ফেলতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা দরকার। মানুষকে আমরা সচেতন করছি বিভিন্নভাবে।

তিনি বলেন, এখানে ঠিকাদারের লোকও জড়িত বলে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। এক ঠিকাদারকে ইতোমধ্যে ব্ল্যাকলিস্ট করেছি। আরেক ঠিকাদারের লোককে হাতেনাতে ধরে থানায় সোপর্দ করেছি। আমরা এই ব্যাপারে সোচ্চার।’

আর রামচন্দ্রপুর, বড়চেগসহ রহিমপুর ইউনিয়নের মানুষকে আর কোনো দালালকে টাকা না দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই বছর জুলাইয়ের মধ্যে এই ইউনিয়নে শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত হবে।

রিপন দে/এফএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।