৩৪ বছর ধরে টাকা নেন না তিনি
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার কার্তিকপাড়া একেবারেই অজোপাড়া গাঁ। পুঠিয়া ও জেলার দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এই গ্রামটিতে সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে নিঝুম নিরবতা। আঁধারের বুক চিরে কিছু মানুষ এখানে আলো জ্বালিয়ে রাখেন। এদের একজন মনসুর রহমান।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অবসরে গেছেন।
এলাকার মানুষের কাছে তার পরিচিতি কেবলই বন্ধু, নিখরচার ডাক্তার। গত তিন বছর ধরে বিনা পয়সায় এই গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন অধ্যাপক ডা. মনসুর। বিনামূল্যে দিচ্ছেন ওষুধ। ওষুধ কেনার পয়সাও দিচ্ছেন কাউকে কাউকে।
গত ৫ বছর ধরে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি পদে রয়েছেন অধ্যাপক মনসুর। জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদকের পদে রয়েছেন। চেয়েছিলেন, এখানকার চেম্বার থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এলাকার মানুষের ভোগান্তি দেখে সেবার দরজা খুলে দেন।
প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে চেম্বার। এর আগে সকাল থেকে দুর্গাপুরের তাহেরপুরে পৌর এলাকার হাইস্কুল মার্কেটের একটি ওষুধের দোকানে বসে রোগী দেখেন ডা. মনসুর। সেখানেও নিখরচায় সেবা দেন। কয়েক জায়গা ঘুরে এখানে এসে থিতু হয়েছে তার এই চেম্বার।
অত্যন্ত সাদাসিদে এই মানুষটির জন্ম পাশের দুর্গাপুর উপজেলার আড়াইলে। বেড়ে ওঠাও গ্রামে। গ্রামের জল-হাওয়ার কাছে অনেক ঋণ তার। আজন্ম ঋণ শোধে ৩৪ বছর ধরে এলাকায় নিখরচার স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন।

এলাকার হতদরিদ্র মানুষগুলো তার সেবা পেয়ে আপ্লুত। ফেরার পথে প্রাণভরে দোয়া করে যান কেবলই। গণমনুষের দোয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গুণী এই মানুষটিকে।
ডা. মনসুর রহমান অবসরে যাবার পর বিভাগে অধ্যাপক পায়নি রামেক। এখনও তিনি সেখানে সময় দেন ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবে। একাডেমিক কার্যক্রমসহ পরীক্ষা-সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্বপালন করেন।
দায়িত্বপালন করেন বেসরকারি বারিন্দ মেডিকেল কলেজে। পরিবার নিয়ে তিনি থাকেন রাজশাহী নগরীর কাজিহাটা এলাকায়। তারপরও ছুটির দিনের পুরো সময়টা এলাকার মানুষের জন্যই বরাদ্দ। উৎসবেও ভাটা পড়েনি দায়িত্বে। ১৯৮৪ সাল থেকেই এই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন অধ্যাপক ডা. মনসুর।
গত শুক্রবার তাহেরপুর পৌর এলাকার হাইস্কুল মার্কেট চেম্বারে গিয়ে দেখা মেলে বিভিন্ন বয়সী প্রায় অর্ধশত রোগীর। বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে তারা এসেছেন। এরা প্রায় সবাই খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষ।
পাশের গোপিনাথপুর খাসখামার গ্রামের হামেদ ফকির। বয়স পেরিয়েছে ৮০। তিনিও চিকিৎসা নিতে এসেছেন এখানে। বেরিয়ে যাবার সময় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। শরীরজুড়ে ব্যথা নিয়ে চলাফেরায় কষ্ট হচ্ছিল তার।

বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আগের তুলনায় এখন ভালো। এবার কিছু ওষুধ লিখে দিলেন ডাক্তার। কেনার পয়সা নেই জেনে ৫শ টাকা হাতে ধরিয়ে দিলেন। যাবার বেলায় প্রাণ ভরে দোয়া করে গেলেন এই বৃদ্ধ।
কিশমত গণকৈড় গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব জমির উদ্দিন সরকারেরও প্রায় একই সমস্যা। তিনি বলেন, শহরের ডাক্তারের কাছে গেলে ৫শ টাকা ফি। তার উপরে আছে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এত কিছু করার সামর্থ নেই তার। হাতের কাছে এমন টিকিৎসক পেয়ে খুশি তিনি।
গত ৫ বছর ধরে এখানে নিখরচায় চিকিৎসা নিচ্ছেন পুঠিয়ার মন্ডলপাড়া এলাকার হতদরিদ্র গৃহবধূ ভারতী রানী (৫৫)। তিনি বলেন, চিকিৎসা নিতে পয়সা লাগেনি কখনও। উল্টো ওষুধ কেনার পয়সা পেয়েছেন। তাই সামান্য অসুখ হলেই চলে আসেন এখানে। নিজের ছাড়াও পরিবার ও এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়েও আসেন তিনি।
প্রায় ৩০ বছর ধরে পুরো পরিবারের সবারই চিকিৎসা করাচ্ছেন তাহেরপুরের বাসিন্দা নিপেনন্দ্রনাথ হালদার মনু। হাতের কাছে এমন সেবা পেয়ে খুশি তিনি।
রোগী দেখা শেষে এ নিয়ে কথা হয় অধ্যাপক ডা. মনসুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ছোটখাটো নানান স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে এলাকার মানুষ তার কাছে আসে। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি এই কাজ করে যাচ্ছেন।

ফি ছাড়াই রোগীদের ব্যবস্থাপত্রও দেন তিনি। তবে কেউ কেউ খুশি হয়ে কিছু অর্থও দেন। সেটিই আবার দিয়ে দেন হতদরিদ্রদের মাঝে। কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দেয়া সৌজন্য ওষুধ বিলিয়ে দেন। জীবনভর এলাকার মানুষের সেবা করতে চান তিনি।
কথার ফাঁকেই কার কার বেজে উঠছিল মুঠোফোন। প্রত্যেকের নাম ধরে কথাও বলছিলেন ডা. মনসুর রহমানের। একজনের কথপোকথন শুনে বোঝা গেল, তার বাড়ি এলাকাতেই। উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে ভর্তি করাতে হবে রামেক হাসপাতালে। সেখানে বসেই সব বন্দোবস্ত করলেন এই অধ্যাপক।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তার মুঠোফোন খোলা। এলাকার সব মানুষই প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তাকে ফোন দেন। অধিকাংশ ফোন আসে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা সংক্রান্ত। সাধ্যমত ব্যবস্থা করে দেন তিনি।
জানা গেছে, ডা. মনসুর রহমান দুর্গাপুর উপজেলার কিশমত গণকৈড় ইউনিয়নের আড়াইল গ্রামের মরহুম আব্দুর রহমান মন্ডলের ছেলে। ৩১ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭০ সালে রাজশাহী মুসলিম হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন।
১৯৭২ সালে রাজশাহী সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৮০ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৯৩ সালে বিসিপিএস থেকে এমসিপিএস (ফরেনসিক মেডিসিন) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
এমএএস/জেআইএম