একসঙ্গে চার পদে স্বাস্থ্য সহকারী মহিউদ্দিন!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক স্বাস্থ্য সহকারীর বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করেও দমানো যায়নি তাকে। অভিযুক্ত মো. মহিউদ্দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সহকারী পদে কর্মরত আছেন। জেলা স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) এক নেতার ছত্রছায়ায় মহিউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে তার দুর্নীতির মহাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন মহিউদ্দিন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বাস্থ্য সহকারী মহিউদ্দিন অবৈধভাবে চারটি পদ আকড়ে ধরে আছেন। বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সেখানকার এমটিইপিআই, স্টোরকিপার, পরিসংখ্যানবিদ ও লেপট্রোসি কন্ট্রোলারের পদ তার দখলে। তবে নিজের কাজ না করে প্রশাসনিক কাজ নিয়ে সবসময় ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
যদিও জেলা সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, বিজয়নগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো পদ সৃষ্টি হয়নি, সরকারি মামলাগুলো দেখাশোনা করার জন্য মহিউদ্দিনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
মহিউদ্দিনের দুর্নীতি নিয়ে গত ৯ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে স্বাস্থ্য সহকারীদের পক্ষে ইকবাল নামে বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মচারী একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এর আগে ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই মহিউদ্দিনের দুর্নীতির বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়াই অবৈধভাবে বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য বরাদ্দ মোটরসাইকেলের জ্বালানি, ভিটামিন, কৃমিনাশক ট্যাবলেট, পুষ্টি ও ইপিআই সংক্রান্ত বিলসহ অন্যান্য বিলের টাকা উত্তোলন করে সেগুলো আত্মসাৎ করছেন মহিউদ্দিন। তার এসব কর্মকাণ্ডে জেলা সম্প্রসারণ টিকাদান কেন্দ্র (ইপিআই) প্রধান আমিনুল ইসলাম সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমেপ্লক্সের স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সকল স্বাস্থ্য সহকারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য বিল-ভাউচারের টাকা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে উত্তোলন করার কথা। কিন্তু বেতন-ভাতাদি উত্তোলন করা হলেও সেখানকার বিল-ভাউচারের টাকা কৌশলে সদর উপজেলা পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়াই অবৈধভাবে উত্তোলন করেন মহিউদ্দিন।
এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং ওষুধ পরিবহন বিল বাবদ বেশ কয়েকজনের টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন মহিউদ্দিন। বিষয়টি নিয়ে কমিউনিটি হেলথ্ কেয়ার প্রোভাইডারদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে এসব বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে গেলেই স্বাচিপ নেতা ও ইপিআই সুপারের প্রভাব খাটিয়ে মহিউদ্দিন তাকে বিভিন্নভাবে বদলি ও শোকজ করান বলেও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সম্প্রসারণ টিকাদান কেন্দ্র (ইপিআই) প্রধান আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি যোগদানের পর সারাদেশের মধ্যে ইপিআইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অবস্থান এখন দ্বিতীয়। ইপিআই ছাড়া আমি অন্য কোনো কাজ করতে পারি না। কারো বেতন বন্ধ করে দেয়া বা চাকরি খেয়ে নেয়ার ক্ষমতা নেই। মহিউদ্দিনের সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে অভিযোগের বিষয়টি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
তবে অভিযুক্ত মো. মহিউদ্দিন বলেন, বিজয়নগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মূলত কোনো পদই সৃষ্টি হয়নি। এটা একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। আমাকে ইপিআইয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নিজের বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন মহিউদ্দিন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. নিশীত নন্দী মজুমদার বলেন, বিজয়নগরে নতুন একটা হাসপাতাল হয়েছে। এটার কোনো লোকবল নেই। হাসপাতালটি চালাতে হলে কিছু দায়িত্ব কাউকে না কাউকে নিতে হবে। এখানে যে মালপত্র ঢুকছে সেটা দেখবে কে? বিজয়নগরে কোনো পদই নেই, কাউকে পদায়নও করা হয়নি। যেহেতু মহিউদ্দিন সেখানে আছে তখন তাকে বলা হয়েছে এগুলো দেখাশোনা করার জন্য। এটা নিয়ে কেউ যদি বলে একজন চার পদে আছে সেটা তো যুক্তিগত কথা হতে পারে না। আর বিল-ভাউচার দেয়ার মালিক হলাম আমরা, না বুঝে তো আর তাকে (মহিউদ্দিন) কিছু দেয়া হবে না।
আজিজুল সঞ্চয়/এফএ/পিআর