মিষ্টির টাকা দিলে বদলি হয় প্রাথমিকের শিক্ষকদের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ০৯:৩৩ পিএম, ০২ এপ্রিল ২০১৯

 

নওগাঁয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে নিয়মনীতিকে আঙুল দেখিয়ে চলছে রমরমা বদলি বাণিজ্য। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বদলির নিয়ম থাকলেও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বদলি করা হয়েছে যে কাউকে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে বদলিকৃত আবেদন স্বাক্ষর করতে মিষ্টি খাওয়ার নামে শিক্ষকদের গুনতে হচ্ছে টাকা। অফিস সহায়ক সিরাজুল ইসলামসহ বিভিন্ন উপজেলার বদলি সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা কর্মচারীদের মাধ্যমে এ টাকা যাচ্ছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের পকেটে। শিক্ষকরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়মিত বদলি হয়ে থাকে। এ বছরের গত ৩১ মার্চ নিয়মিত বদলি হয়ে গেলো। এ বদলিতে নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ব্যাপক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার ২নং শেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল মতিন। বাড়ি একই উপজেলার বারাতল গ্রামে। তিনি ২০০৩ সালে উপজেলার ব্যাশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। সেখানে ২ বছর অবস্থান করে ভরট্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হন। এরপর থেকে এখন ২নং শেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করছেন তিনি।

চলতি বছরের ২ জানুয়ারি উপজেলার মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য আবেদন করলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সেটি গ্রহণ করেননি। অথচ ২০০৭ সালে চাকরিতে যোগদান করা জুনিয়র শিক্ষক মাকসুদা খানমকে সেখানে বদলি করা হয়েছে।

এরপর সুযোগ মতো বদলগাছি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হবে বলে আব্দুল মতিনকে আশ্বস্ত করেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। সেখানে তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। শূন্য পদের বিপরীতে ১৫ জানুয়ারি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশ নিয়ে মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য আবেদন করেন তিনি।

এ শূন্য পদের বিপরীতে ফয়জাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক অনিল কুমার এবং জিধিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সানিয়া মির্জাকে আবেদনের প্রেক্ষিতে মার্চ মাসে মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। কিন্তু আব্দুল মতিনকে মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হবে, দিচ্ছি, দেব বলে কালক্ষেপণ করেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।

এদিকে, মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অপর একটি শূন্য পদের বিপরীতে গত ২৮ মার্চ গোবরচাপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নুরুন নাহার নামে এক শিক্ষক বদলির জন্য আবেদন করলে স্থানীয়রা আপত্তি জানালে সেটি ফেরত দেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তিতে আবারও তিনি আবেদন করলে সেটি গ্রহণ করেন শিক্ষা কর্মকর্তা।

মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষক আব্দুল মতিন বার বার শিক্ষা কর্মকর্তাকে তাগাদা দিলে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন শিক্ষা কর্মকর্তা। দাবিকৃত টাকা দিতে আপত্তি জানালে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে নুরুন নাহারকে মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়।

এদিকে, ২০০৯ সালে সহকারী শিক্ষক পদে নাহিদা সুলতানা নিয়োগ পেয়ে তেঘরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তিনি কোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া জন্য এ বছর শিক্ষা অফিসে আবেদন করেন। কিন্তু তার আবেদন মঞ্জুর না করে ২০১১ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত কয়াভবানিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক উম্মে আতিয়াকে কোলা স্কুলে বদলি করা হয়।

গয়েশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহমুদা খাতুন বদলির আবেদন করেছিলেন ২নং শেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য পদে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তাকে ওই স্কুলে বদলি না করে রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার বনগাঁ চক-রহমত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিতালী কিসকুকে শেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। মিতালী কিসকু রোববার স্কুলে যোগদান করেছেন।

বদলগাছী উপজেলার ভুক্তভোগী সহকারী শিক্ষক আব্দুল মতিন বলেন, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বদলি করার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বার বার তাগাদা দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমার কাছে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। বিষয়টি আমার পরিচিত এক ভাইকে জানানো হলে উল্টো শিক্ষা কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) আমাকে মোবাইল ফোনে হুমকি দেন। তিনি আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দিয়ে চাকরি খেয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন।

বিলাশবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আফতাব হোসেন বলেন, আমি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান এবং নিজেও রাজনীতি করি। নিয়নপুর স্কুলের জায়গা দখল করে স্থানীয় কয়েকজন যুবক দোকান করার প্রতিবাদে শিক্ষা অফিসে একটা দরখাস্ত দিয়েছিলাম। সে কারণে উপজেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান আমাকে অফিসে ডেকে রাজনীতি করতে নিষেধ করেন এবং চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকি দেন। এসব বিষয় নিয়ে স্যার বিভাগীয় অফিসে আমার নামে অভিযোগ দিয়েছেন। এ কারণে আমাকে গত মাসের ২৩ মার্চ নিয়নপুর স্কুল থেকে বিলাশবাড়ী স্কুলে বাড়ি থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু আমি বদলির জন্য কোনো আবেদন করিনি। অনেকে আবেদন করেও বদলি হতে পারছেন না।

বদলগাছী উপজেলায় জ্যেষ্ঠতার বিচার না করে বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের বদলি করা হয়েছে। এ চিত্র বদলগাছীসহ জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলায়।

রোববার (৩১ মার্চ) বদলির ছিল শেষ দিন। জেলা শিক্ষা অফিসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষকদের ছিল উপচেপড়া ভিড়। তারা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সুপারিশ নিয়ে জেলা শিক্ষা অফিসে এসেছিলেন। অফিসের অফিস সহায়কের কাছে বদলির আবেদনপত্র জমা দিয়ে স্মারক নাম্বার নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা। আবেদনে স্মারক নাম্বার বসানোর পর শিক্ষকদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন অফিস সহায়ক।

মান্দা উপজেলার এক শিক্ষিকার স্বামী গোলাম মোস্তফা বলেন, আমার স্ত্রী খালেদা খানম উপজেলার ভারশোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ওই স্কুল থেকে কালীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলির জন্য কাগজপত্র নিয়ে জেলা শিক্ষা অফিসে যাই। আবেদনপত্রে স্মারক নাম্বার বসানোর পর অফিস সহায়ক সিরাজুল ইসলামকে মিষ্টি খেতে টাকা দিতে হয়েছে। একেক জনের কাছ থেকে ৪-৫ হাজার টাকা করে নেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহায়ক সিরাজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকরা খুশি হয়ে মিষ্টি খাওয়ার জন্য কিছু টাকা দিয়েছেন। আমি কারও কাছ থেকে জোর করে টাকা নিইনি। এ বিষয়ে শিক্ষকদের অভিযোগও নেই।

বদলগাছী উপজেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শিক্ষকদের বদলি করা হয়েছে। প্রকল্প থেকে যেসব শিক্ষক আসছেন তারা যোগদানের পর থেকে জ্যেষ্ঠতা বিবেচনা করা হয়েছে। এছাড়া মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলির জন্য আব্দুল মতিন আবেদন করেননি। আব্দুল মতিনকে হুমকি দেয়া হয়নি। তবে আমার যতটুকু ক্ষমতা ততটুকু বলা হয়েছে। ঘুষ দাবি করার বিষয়টি ভিত্তিহীন। এছাড়া বিভাগীয় অফিসের সুপারিশের ভিত্তিতে জেলার বাইর থেকে এক শিক্ষককে শেরপুর স্কুলে যোগদান করানো হয়েছে।

নওগাঁ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, আমার কাজ শুধু আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করা। আমি সে দায়িত্ব পালন করে আবেদনপত্র ছেড়ে দিয়েছি। ভুক্তভোগী কোনো শিক্ষক টাকা নেয়ার বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেননি।

আব্বাস আলী/এএম/এমএস