অদম্য মেধাবী হেলাল কি পারবে দারিদ্র্যের বাধা টপকাতে?

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শেরপুর
প্রকাশিত: ০৯:৩৩ পিএম, ২২ মে ২০১৯

অনেক কষ্ট-যাতনা, টানাপোড়েনের মধ্যেও এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে চলেছেন হেলাল উদ্দিন। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা-মার ছাড়াছাড়িও (বিবাহ-বিচ্ছেদ) তাকে দমাতে পারেনি। নানার কাছে থেকে চালিয়ে গেছেন পড়ালেখা।

পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিসহ জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। সেই বৃত্তির টাকায় চলেছে তার লেখাপড়া।

শেরপুরে নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পোড়াগাঁও আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়া হেলাল উদ্দিনের স্বপ্ন বড় হয়ে প্রকৌশলী হওয়ার। প্রকৌশলী হয়ে সৎভাবে, দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করবেন। এতদিন নানাবাড়িতে থেকে খেয়ে না খেয়ে হেলাল লেখাপড়া চালিয়ে গেলেও এখন কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে মাথায় ভর করছে দুশ্চিন্তা।

আরও পড়ুন >> রিকশার চাকায় কলেজছাত্রের ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা

স্কুলপর্যায়ে পড়তে কোনো অর্থের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু কলেজে ভর্তি, শহরে থাকা-খাওয়াসহ লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া তার জন্য কঠিন। মেধাবী হেলাল কি পারবেন দারিদ্র্যের বাধা টপকে স্বপ্ন পূরণ করতে?

হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার বাবা-মা বেঁচে থাকলেও তিনি তাদের স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। বাবা তার কোনো খোঁজখবরই নেন না। মা হঠাৎ খোঁজখবর নেন। তিনি যখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র তখন বাবা-মার মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়। তারপর থেকে নানা-নানির সঙ্গে নানাবাড়িতে থাকা।

বাবা ওমর ফারুক পরে অন্যত্র বিয়ে করেন। মা হেলেনা আক্তারও অন্য আরেকজনকে বিয়ে করে নারায়ণগঞ্জে সংসার পেতেছেন। নানা হযরত আলীর বাড়ির ভিটা ছাড়া কোনো আবাদি জমি নেই। কিছু জমি বর্গাচাষ করেন। মামা মিরাজ আলম গাজীপুরের একটি গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। সেই মামার আয় থেকে দেয়া কিছু টাকা আর বর্গাচাষের আয় থেকে চলে নানার সংসার। মাছ-মাংস ওভাবে খাওয়া হতো না, দুধ-ডিমও মিলতো না। সকালে না খেয়েও কখনও কখনও স্কুলে যেতে হয়েছে। খালাতো আরেক ভাইয়ের সঙ্গে ছোট একটি টেবিলে ভাগাভাগি করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। নানা-নানির সঙ্গে ছোট একটি ভাঙা চৌকিতে ঘুমানো- এভাবে চলেছে তার শিক্ষাজীবন।

কুপির আলোয় চলতো লেখাপড়া। বছরখানেক হলো নানাবাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ লেগেছে। বিদ্যুতের আলোকচ্ছটা পেলেও মাঝে মধ্যে নিজ থেকেই সব ছেড়ে হারিয়ে যাওয়ার তীব্র বাসনা চেপে বসে। কিন্তু নানা তাকে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। কখনও তাকে মনোবল হারাতে দেননি। সর্বদা আগলে রেখেছেন। সেই নানাই তার মা-বাবা। নানা তাকে মা-বাবার মতো আদর করেছেন, শাসন করেছেন। তার কারণেই হেলাল আজ এমন চমকপ্রদ ফলাফল করতে পেরেছেন।

আরও পড়ুন >> জিপিএ-৫ পেয়েও কাঁদছে মাহবুবা

একই সঙ্গে শাহীন মিয়া নামে এক সেনাসদস্যের কথা স্মরণ করে হেলাল বলেন, অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা বাদ দিতে চেয়েছিলাম। গার্মেন্টসে চলে যেতে চেয়েছিলাম। শাহীন সাহেব তখন আমাকে বুঝিয়েছেন, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছেন। খাতা-কলম দিয়ে সহায়তা করেছেন। এসএসসি পরীক্ষার আগে নন্নী শার্ক আইডিয়াল একাডেমিতে কোচিংয়েরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

স্কুল কর্তৃপক্ষ আমার কাছ থেকে কোনো বেতন-ভাতা বা ফি নেননি। যে কারণে আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে- বলেন অদম্য মেধাবী হেলাল।

‘কষ্ট লাগে, বাবা-মা নেই। ভাগ্য আমার এমন কেন! জেদ চাপে, আমাকে বড় হতে হবে, বাবা-মাকে দেখিয়ে দিতে হবে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বাবা-মার ছাড়াছাড়ি উচিত নয়। যারা এমন করে, তাদের সন্তানরা খুব কষ্ট পায়।’ নানাবাড়ির আঙ্গিনায় বসে কথাগুলো বলার সময় চোখে পানি ছলছল করছিল হেলালের। তিনি আরও বলেন, ‘আমার লেখাপড়ার জন্য কেউ এগিয়ে এলে ভালো হয়। আসলে হেল্প (সহায়তা) ছাড়া আমার পক্ষে উচ্চশিক্ষা তো সম্ভব নয়।’

হেলালের নানা হযরত আলী বলেন, ‘আমার তো বাড়িভিটা ছাড়া আর কিছু নেই। পুলায় (ছেলে) গার্মেন্টসে কাম কইরা মাসে মাসে কিছু ট্যাহা পাডায়, ওই ট্যাহাতেই কোনোমতে সংসারডা চলে। এতদিন বাড়িতে থাইক্কা, কোনোমতে খাইয়া না খাইয়া হেলালের লেহাপড়াডা চলছে। অহনতো তারে কলেজে ভর্তি অওয়ন নাগবো, শহরে থাহুন নাগবো, ট্যাহা পামু কই। খুব চিন্তার মইদ্যে আছি। কেউ তার লেহাপড়াডার সাহায্য করলে খুব বালা অইতো। ছোরাডার (ছেলেটার) মুনের আশাডা পুরা অইতো ‘

আরও পড়ুন >> শত কষ্টের মাঝেও সাদিয়ার জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প

দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থী উন্নয়ন সংস্থা-ডপস এর প্রতিষ্ঠাতা সেনাসদস্য শাহীন মিয়া বিএসপি জানান, হেলালের জীবনটা অনেক কষ্টের, অনেক সংগ্রামের। তার স্বপ্ন আছে, আছে ইচ্ছা, একাগ্রতা ও অধ্যবসায়। উচ্চশিক্ষার জন্য একটু সহায়তা পেলে তার জীবনটা বদলে যেতে পারে। আমরা সহযোগিতা দিয়ে তাকে মাধ্যমিক পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। বিশ্বাস করি, কলেজে পড়াশোনার ক্ষেত্রে সহায়তা পেলে সে ভালো ফলাফল করতে পারবে এবং তার স্বপ্নপূরণে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।

পোড়াগাঁও আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হামিদ বলেন, হেলাল খুবই মেধাবী। সবসময় ১/২-এর মধ্যেই তার রোল নম্বর থাকতো। আমরা তাকে বিনামূল্যে পড়িয়েছি। আমার বিশ্বাস সহযোগিতা পেলে হেলাল নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। তার লক্ষ্য পূরণে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।

হাকিম বাবুল/শেরপুর/এমএআর/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :