‘রুহুল আমিনের সঙ্গে শামীমের ২৬ সেকেন্ডের কথোপকথন রেকর্ড আছে’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফেনী
প্রকাশিত: ০৮:৫৬ পিএম, ২১ আগস্ট ২০১৯

ফেনীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফেনী পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. শাহ আলমের সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে তার সাক্ষ্যগ্রহণ নেয়া হয়। তবে এদিন সাক্ষ্য শেষ না হওয়ায় আগামী রোববার তিনি বাকি সাক্ষ্য দেবেন।

আদালত সূত্রের বরাত দিয়ে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট হাফেজ আহাম্মদ বলেন, নুসরাত হত্যা মামলায় ৯২ সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাক্ষী তালিকার সর্বশেষ সাক্ষী পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম। তার সাক্ষ্য প্রদান ও জেরার মধ্য দিয়ে আলোচিত এ মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হব।

আজ আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, ‘গত ১০ এপ্রিল নুমরাত হত্যা মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর হলে তদন্তভার গ্রহণ করি। ঘটনাস্থল ও বিভিন্ন স্থান থেকে বেশকিছু আলামত উদ্ধার ও জব্দ করি। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদ থেকে একটি কালো রঙের কেরোসিন তেল মেশানো পলিথিন, সবুজ রঙের সালোয়ারের পোড়া অংশ, বাটিকের ওড়নার পোড়া অংশ, পাথরের পুঁতির কাজ করা কালো রঙের আগুনে পোড়া বোরকার অংশ, নেভিব্লু রঙের জুতা, ১০টি পোড়া দেয়াশলাইয়ের কাঠি উদ্ধার ও জব্দ করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল একাধিকবার পরিদর্শন করে মানচিত্র তৈরি করি এবং ঘটনার সচিত্র বর্ণনা প্রস্তুত করি। মাদরাসার শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও শিক্ষকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করি এবং তাদের মধ্যে ৪১ জনের বয়ান আদালতের নির্দেশে লিপিবদ্ধ করি। নুসরাতের মৃত্যুর পর তার প্রদান করা মৃত্যুকালীন জবানবন্দি ঢামেকের চিকিৎসকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করি। গত ১৯ এপ্রিল আসামি উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পার দেখিয়ে দেয়া মতে তার ঘরের একটি কক্ষের আলনা থেকে বাদুড় কার্টিংয়ের একটি নীল রঙের বোরকা কয়েকজন সাক্ষীর সামনে জব্দ করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘নুসরাতের পড়ার টেবিল থেকে একটি খাতা উদ্ধার করা হয়। ওই খাতার এক থেকে আট নম্বর পৃষ্ঠায় নুসরাত সিরাজ উদ দৌলার যৌন হয়রানির বর্ণনা লিখে রেখে যায়।’

পিবিআইয়ের পরিদর্শক বলেন, ‘২০ এপ্রিল আসামি সাইফুর রহমান জোবায়েরের দেখানো মতে সোনাগাজীর ডাঙ্গিখাল থেকে তার ব্যবহৃত বোরকা উদ্ধার করা হয়। ২৭ এপ্রিল মুদি দোকানি লোকমান হোসেন লিটনের দোকান থেকে একটি কালো রঙের পলিথিন, নীল রঙের প্লাস্টিক ড্রাম, একটি চোঙ্গা, হাতলযুক্ত একটি এক লিটারের তেল মাপার পাত্র জব্দ করা হয়।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘২৯ এপ্রিল ফেনী পিবিআই অফিসে মামলার অন্যতম সাক্ষী এমদাদ হোসেন পিংকেলের উপস্থাপনা মতে আসামি শাহাদাত হোসেন শামীমের ব্যবহৃত একটি অপ্পো মোবাইল ফোনসেট জব্দ করা হয়। ওই সেটে আরেক আসামি মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিনের সঙ্গে শামীমের ২৬ সেকেন্ডের কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে।’

আদালত সূত্র জানায়, বুধবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলে। সাক্ষীর বাকি অংশ গ্রহণের জন্য আগামী রোববার দিন ধার্য করেন বিচারক। বুধবার শুনানি চলাকালে মামলার সব আসামি আদালতে হাজির ছিলেন।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান তিনি।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ১৬ জনের সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এ মামলায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

রাশেদুল হাসান/এমবিআর/পিআর