‘আসামিরা নুসরাতকে পরিকল্পিতভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফেনী
প্রকাশিত: ০৫:২৩ এএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান হত্যা মামলার সাক্ষ্য ও জেরা কার্যক্রম শেষে বুধবার রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন সরকারি কৌঁসুলী হাফেজ আহম্মদ। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, আসামিরা মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে ৬ এপ্রিল পরিকল্পিতভাবে নুসরাতকে ডেকে মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যায়।

ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে বুধবার মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের প্রথম দিন সরকারি কৌঁসুলী হাফেজ আহম্মদ তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তার অসমাপ্ত বক্তব্য বৃহস্পতিবার উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।

আদালতে তিনি বলেন, ৬ এপ্রিল সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে নুসরাত পরীক্ষার হলে যায়। তার বান্ধবী নিশাত সুলতানাকে মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে মারধর করা হচ্ছে বলে উম্মে সুলতানা পপি ওরফে চম্পা তাকে ডেকে নিয়ে যায়। ছাদে বোরকা-পরা চারজন অবস্থান করছিলেন। তারা হলেন- শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের আহম্মদ, জাবেদ হোসেন ও কামরুন নাহার মনি। তারা মাদরাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নুসরাতের মায়ের মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দেয়। নুসরাত রাজি না হলে তাকে ছাদের ওপর শুয়ে ফেলা হয় এবং ওড়না ছিঁড়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তারা দ্রুত পালিয়ে যায়।

পিপি বলেন, ঘটনা শুরু হয় ২৭ মার্চ। ওইদিন মাদরাসার পিয়ন নুরুল আমিনকে দিয়ে অধ্যক্ষ নুসরাতকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে হাত দেয়, জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানি ও যৌন হয়রানি করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় মামলা দায়ের করেন। ওইদিনই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে পুলিশ গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়।

সরকারি কৌঁসুলী বলেন, ২৮ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজের পক্ষে ও বিপক্ষে সোনাগাজীতে মানববন্ধন করা হয়। অধ্যক্ষের পক্ষে মাকসুদ আলম কাউন্সিলার, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের, শিক্ষক আফছার উদ্দিন, মহিউদ্দিন শাকিল, জাবেদ, পপি, মনি, রানা, মো. শামীম সক্রিয়ভাবে মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করে এবং শিক্ষার্থীদের জোর করে মানববন্ধনে যেতে বাধ্য করা হয়।

তিনি আদালতে বলেন, আসামিদের আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেই দেখা যায়, ১ এপ্রিল নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, ইমরান হোসেন রানা, হাফেজ আবদুল কাদের, বিবি জোহরা এবং ৩ এপ্রিল মাওলানা মোহাম্মদ হোসাইন, শাহাদাত হোসেন শামীম, নুর উদ্দিন, রানা, জাবেদসহ কয়েকজন কারাগারে অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করেন। ওইদিন শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুর উদ্দিনের সঙ্গে অধ্যক্ষ একান্তভাবে কথা বলেন। ওই সময় অধ্যক্ষ তার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতকে চাপ দিতে বলেন। যদি রাজি না হয়- প্রয়োজনে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে প্রচার করতে বলা হয়।

৪ এপ্রিল মাদরাসার হোস্টেলে একাধিক সভা করা হয়। শাহাদাত হোসেন শামীম কেরোসিনের ব্যবস্থা করবে, কামরুন নাহার মনি বোরকা নিয়ে আসবে এবং কারা ছাদে থাকবে, কারা সাইক্লোন শেল্টারের নিচে থাকবে এবং কারা মাদরাসার গেটে থাকবে সব দায়িত্ব ঠিক করা হয়। ওই বৈঠকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা মুক্তি পরিষদ গঠন করা হয়। এতে নুর উদ্দিনকে আহ্বায়ক, শাহাদাত হোসেন শামীম যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহিউদ্দিন শাকিলকে সদস্য সচিব করা হয়। বৈঠকে জাবেদ জোবায়ের, ইমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা, আবদুর রহিম শরীফ, মো. শামীমসহ অনেকেই ছিলেন।

এ ঘটনায় ৮ এপ্রিল তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে আটজনের নাম উল্লেখ সোনাগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যায়। ১০ এপ্রিল মামলাটি পুলিশ হেড কোয়ার্টারের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর করা হয়।

এ মামলায় মোট ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহ আলম তদন্ত শেষে ২৯ মে ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ৫ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। অভিযোগপত্রভুক্ত ১৬ আসামির মধ্যে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ১২ জন ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।

রাশদেুল হাসান/বিএ