একজন শহীদ পুলিশ কনস্টেবলের স্ত্রীর আকুতি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ১১:২৬ এএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বৃদ্ধা সাজেদা বেগম (৬২) একজন শহীদ পুলিশ কনস্টেবলের স্ত্রী। তার স্বামী হারিস চৌধুরী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতে কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সে কর্তব্যরত অবস্থায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সে শহীদ পুলিশ সদস্যদের স্মৃতিফলকে হারিস চৌধুরীর নাম থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম লিপিবদ্ধ না থাকায় এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হয়নি তাকে। এর ফলে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও স্বামীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়াসহ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার দাবিতে লড়াই করতে হচ্ছে বৃদ্ধা সাজেদা বেগমকে।

গত ১০ বছর ধরে হতদরিদ্র এই বৃদ্ধা সবার দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তার স্বামীর প্রাপ্য সম্মানের জন্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে বারবার খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাকে।
বর্তমানে একমাত্র মেয়ে রুনা বেগমের শ্বশুরবাড়িতেই অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে তার। জীবনের এই শেষ বেলায় এসে তিনি স্বামীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়াসহ রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা দেয়ার আকুতি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।

গত মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের মিনারকোট গ্রামে বৃদ্ধা সাজেদা বেগমের মেয়ে রুনা বেগমের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তার। মেয়ের জামাই আব্দুল হাকিমও আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। বাড়িতে একটি টিনের ঘর ও একটি মাটির ঘর রয়েছে তার।

সাজেদা বেগম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ঘাটুরা গ্রামের মন্নাফ মিয়ার মেয়ে। ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে পারাবারিকভাবে সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের আব্দুল মালেক চৌধুরীর ছেলে হারিস চৌধুরীর সঙ্গে সাজেদা বেগমের বিয়ে হয়।

জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপচারিতায় সাজেদা বেগম জানান, মাত্র ১৩ বছর বয়সে হারিস চৌধুরীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের আগেই পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরিতে যোগ দেন হারিস চৌধুরী। সংসার জীবনের সবকিছু বুঝে ওঠার আগেই স্বামীকে হারান তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পাঁচ মাস পর মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন সাজেদা। সেই মেয়ের নাম রাখা হয় রুনা বেগম। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর সাজেদার জীবনে নেমে আসে দুঃখ-দুর্দশা। বাবা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল না হওয়ায় তার দুঃখ আরও বেড়ে যায়। অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে মেয়ে রুনাকে ভালো জামা-কাপড়ও পরাতে পারেননি কখনও। চরম দারিদ্র্যতার মধ্যে বেড়ে ওঠে রুনা। সাজেদা বেগম শ্বশুরবাড়ি থেকে এক খণ্ড জায়গা পেয়েছিলেন। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির আর্থিক অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না।

Bbaria02.jpg

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাজেদা বেগম জানান, তিনি স্বামীর মৃত্যুর পর আর বিয়ে করেননি। মেয়ে রুনাকে নিয়েই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন। শ্বশুরবাড়িতে কিছুদিন থাকার পর চলে আসেন বাবার বাড়িতে। তখন থেকেই মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। দারিদ্র্যতার কারণে মেয়েকে কখনোই ভালো খাবার খাওয়ানো কিংবা ভালো জামা-কাপড় পড়াতে পারেননি। রুনাকেও অল্প বয়সেই আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের মিনারকোট গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হাকিমের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়। বিয়ের পর থেকে মেয়ে রুনার সঙ্গেই তার শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছেন সাজেদা বেগম।

সাজেদা বেগম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সে গিয়ে স্বামী হারিস চৌধুরী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হওয়ার খবর পাই। কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সে দেশের জন্য শহীদ হওয়া পুলিশ সদস্যদের স্মৃতিফলকে হারিস চৌধুরীর নাম রয়েছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম লিপিবদ্ধ না থাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না। এর ফলে অর্থ কষ্টে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে চরম দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। বার্ধক্যজনিত রোগের কারণে প্রতিদিন ১০০ টাকার ওষুধ লাগে। কিন্তু সংসার চালিয়ে প্রতিদিনের এই ওষুধের টাকার যোগান দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে জামাই আব্দুল হাকিমকে। মৃত্যুর আগে তাই স্বামীর প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়ার জন্য সরকারের কাছে আকুতি জানাই।

সাজেদা বেগমের জামাই আব্দুল হাকিম জাগো নিউজকে বলেন, স্ত্রী আর ৯ ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমার সংসার। বিয়ের পর থেকে আমার শাশুড়ি আমাদের সঙ্গেই থাকেন। গরু পালন আর কৃষি কাজ করে সংসার চালাই। গত ১০ বছর ধরে শ্বশুরকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার আশায় বৃদ্ধা শাশুড়িকে নিয়ে ঘুরছি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুমিল্লা পুলিশের কাছে অনেকবার গিয়েছি। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে কোনো কাজ হচ্ছে না। তাই সরকারের কাছে দাবি আমার শ্বশুরকে স্বীকৃতি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সুযোগ-সুবিধা দেয়া হোক।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর দফতর) মো. আবু সাঈদ জাগো নিউজকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম স্বশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল পুলিশ। দেশের জন্য জীবন দিয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় শহীদ পুলিশ কনস্টেবল হারিস চৌধুরীর নাম না থাকাটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/এমএস