গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের নামে সরকারি টাকা হরিলুট

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ১২:৫৬ পিএম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার কর্মসূচির নামে বরাদ্দের টাকা হরিলুট করা হয়েছে। সিংহভাগ এলাকায় কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। একসঙ্গে একাধিক প্রকল্পসহ সীমিত সময় এবং জুনের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করাকেই দায়ী করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলার তিস্তা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় চিলমারী উপজেলায় রয়েছে ছয়টি ইউনিয়ন। দারিদ্র্যপীড়িত এই উপজেলায় সরকারিভাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারে ১ম ও ২য় পর্যায় টেস্ট রিলিফের (টিআর) ৮৭টি প্রকল্পে ১২ কোটি ৪৮ লাখ ২ হাজার ৯০১ টাকা, কাজের বিনিময় টাকার (কাবিটা) ১৩টি প্রকল্পে ৪ কোটি ৫২ লাখ ৪ হাজার ১০০টাকা এবং কাজের বিনিময় খাদ্যের (কাবিখা) ৮টি প্রকল্পে ৩১লাখ ৩৫ হাজার ২১ টাকা ও ১৪টি প্রকল্পে ২৩৬ দশমিক ৮৬০২ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, থানাহাট ইউনিয়নের চিলমারী মডেল থানার সামনে নুরুল হকের পুকুর পাড় থেকে বারি মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের জন্য ১ লাখ ২৮ হাজার ২০০ টাকা এবং মাটিকাটা নুরানী মাদরাসা হতে ওমর হাজীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের চর উদনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ ভরাটের জন্য ৭০ হাজার টাকা, সোনবোন পাড়া পাকা রাস্তা হতে ইয়াকুবের বাড়ি পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৭০০ টাকা, ময়জুদ্দি মেম্বারের বাড়ি হতে বৈরাগীরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের জন্য ৭৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও কোনো কাজই করা হয়নি। অথচ কাগজ-কলমে কাজ সমাপ্ত দেখিয়ে জুনের মধ্যেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোকছেদ (৫০), মজিবর (৪৫) ও আমেনা বেগম (৩০) বলেন, ব্রাক মোড় থেকে রেলক্রসিং পর্যন্ত কাচা রাস্তা এবং অধিকারী পাড়া থেকে পূর্বদিকে মকবুলের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার জন্য ৪৩ হাজার ২৮০ টাকা করে বরাদ্দ দিলেও এখানে এক কোদাল মাটি কাটা হয়নি। রাস্তা থেকে রেল ক্রসিং উঁচু হওয়ায় প্রায় সময় দুর্ঘটনা ঘটে। নুরুল হকের পুকুর পাড় হতে বাড়ি মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের নামে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা স্থানীয়রা কেউ জানেন না।

kurigram01

স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী (৫০), শমসের মিয়া (৫৫) ও ফজলু মিয়া (৬০) অভিযোগ করেন, প্রচার-প্রচারণা না থাকায় স্থানীয়রা বরাদ্দের বিষয়ে জানতে পারে না। যার কারণে মাঠ পর্যায় কাজ না করেই প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের লোকজন আঁতাত করে সরকারের উন্নয়নের টাকা পকেটে তোলেন। ফলে সরকার উন্নয়ন করলেও এর সুফল মাঠপর্যায়ে মানুষ পায় না।

মাটিকাটা নুরানী মাদরাসা থেকে ওমর হাজির বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের কোনো কাজ হয়নি বলে জানান ওমর হাজী (৬৫)। বন্যার সময় পানি উঠলেও তার আগে ও পরে এই রাস্তার কোনো কাজ করা হয়নি।

স্থানীয়রা বলেন, নিজেরা চাঁদা তুলে বন্যার পরে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামত করেছি। এখানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।

রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের সোনবোন পাড়ার বাসিন্দা ইয়াকুব আলী (৬৫) বলেন, আমার বাড়ি থেকে সোনবোন পাড়ার পাকা রাস্তা পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। এখানে বরাদ্দ এসেছে আমরা জানিই না।

চর উদনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবলু মিয়া বলেন, আমার স্কুলে ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার কান্ট্রি প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে মাটি কেটে দিয়েছিল। কিন্তু টিআর প্রকল্পে মাঠ ভরাটের নামে যে ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেই টাকার মাটি কাটা হয়নি। আমি নিজেও জানি না আমার স্কুলের নামে মাঠ ভরাটে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বৈরাগীরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন, ময়জুদ্দি মেম্বারের বাড়ি থেকে স্কুলের রাস্তা মেরামতের কথা শুনেছিলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই রাস্তা সংস্কার হয়নি।

kurigram03

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জনপ্রতিনিধি বলেন, যে টাকা বরাদ্দ আসে সেই টাকার কমিশন দিতে হয় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। তাই সব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না।

তারা আরও বলেন, সরকারের একাধিক প্রকল্প আসে বছরের মাঝামাঝি সময়। যা অল্প সময়েই শেষ করার নির্দেশ থাকে। প্রকল্প শেষ হতে না হতেই বন্যা চলে আসে। ফলে অনেকেই নামকাওয়াস্তে বন্যা শুরুর কয়েকদিনের মাথায় কাজ করলেও পরে বন্যায় ক্ষতি দেখানো হয়। নজরদারি বাড়ানোসহ বছরের শুরু এবং বন্যার পরে প্রকল্প দিলে দুর্নীতি অনেকটাই কমে আসবে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ কোহিনুর রহমান বলেন, কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রকল্প কমিটিকে চেকের মাধ্যমে টাকা দেয়া হয়।

অনেকেই প্রকল্পের বিষয় জানেন না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবাই প্রকল্পের বিষয়ে জানেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ মো. শামসুজ্জোহা জানান, এ উপজেলা বালুমাটির হওয়ায় রাস্তার স্থায়িত্ব কমে যায়। এরপর বন্যায় প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

নাজমুল হোসাইন/আরএআর/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।