রায় শুনে কাঁদলেন নুসরাতের বাবা, চাইলেন নিরাপত্তা
বহুল আলোচিত ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ১৬ আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। আদালতের এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষসহ নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা।
রায় ঘোষণার পর আদালত কক্ষের বাইরে এসে কেঁদে ফেলেন নুসরাতের বাবা একেএম মুসা মানিক। রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে মুসা মানিক বলেন, আল্লাহর দরবারে অনেক অনেক শুকরিয়া। যে রায় দেয়া হয়েছে এতে আমরা সন্তুষ্ট। আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, গণমাধ্যম, ডিসি-এসপিসহ প্রশাসনের সব কর্মকর্তা, সচেতন নাগরিক যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন সবার প্রতি কৃতজ্ঞ আমরা।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের পূর্ণ নিরাপত্তা দাবি করছি। আমরা যেন নিরাপদে থাকতে পারি সে আশা করছি। এ রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানাচ্ছি।’
এছাড়া রায় ঘোষণার পর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার, মামলার বাদী ও নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান, নুসরাতের সহপাঠী ও সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষকরাও। দ্রুত এ রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মামলার রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্প সময়ের মধ্যে নুসরাত হত্যা মামলা নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়েছিলেন, তিনি তার কথা রেখেছন। এই রায় দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। আমার বোনের হত্যার রায়ে আমরা খুশি। কিন্তু আমরা যেন নিরাপদে থাকতে পারি।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নুসরাতের মাদরাসার বর্তমান অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, এই রায়ের মধ্য দিয়ে যাতে অন্যকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। জন্য অল্প সময়ের মধ্যে রায় কার্যকর হলে এটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
নুসরাতের আত্মীয় আবদুল বাতেন, ওমর ফারুক, সহপাঠী নিশাত সুলতানা, নাসরিত সুলতানা ফূর্তি, কায়সার মাহমুদ, আলা উদ্দিন, জামসেদ আলমসহ অনেকে রায় শুনতে আদালতে আসেন। রায় শুনে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।
বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ নুসরাত হত্যা মামলার রায় দেন। রায় শুনে আদালতের কাঠগড়ায় থাকা ১৬ আসামি নিস্তব্ধ হয়ে যান। পরে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ অন্যরা হাউমাউ করে কেঁদে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদরাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।

এদিকে, রায় ঘোষণার সংবাদ শুনে কোর্ট চত্বরে আসামির স্বজনরা আহাজারি শুরু করেন। আদালত প্রাঙ্গণে আসামি হাফেজ আবদুল কাদেরের বাবা আবুল কাশেম খান, জাবেদ হোসেনের ভাই জাহেদ হোসেন, নুর উদ্দিনের মা রাহেলা বেগম, আবদুর রহিম শরীফের মা নুর নাহার ও ইফতেখার উদ্দিন রানার বাবা জামাল উদ্দিন প্রকাশ্যে এ রায়ের বিরোধিতা করেন। তারা নুসরাত হত্যা মামলাটি মিথ্যা ও তাদের সন্তানদের বিনা দোষে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। এ সময় আসামিদের স্বজনরা উচ্চ স্বরে কাঁদতে থাকেন।
ফেনী জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর হাফেজ আহমেদ বলেন, গত ৩০ মে ফেনীর আমলী আদালতের বিচারক জাকির হোসাইন নুসরাত হত্যা মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর পর ৪৮ কর্মদিবস পর্যন্ত মামলার সাক্ষগ্রহণ ও জেরা অনুষ্ঠিত হয়। ৬১ কর্মদিবসের দিন আলোচিত এই হত্যা মামালার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন আদালত।
গত ২৭ জুন মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এ মামলায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার, বাবা একেএম মুসা ও ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানসহ ৮৭ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
নুসরাত হত্যা মামলায় জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ ও পিবিআই অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ২১ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করে। ২৯ মে ১৬ জনকে আসামি করে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দেয়া হয়। সংশ্লিষ্টতা না থাকায় নূর হোসেন, আলা উদ্দিন, কেফায়েত উল্যাহ জনি, সাইদুল ও আরিফুল ইসলামের নাম অভিযোগপত্রে রাখেনি পিবিআই।
চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়ের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।
এর আগে বিভিন্ন সময় আদালতে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
রাশেদুল হাসান/এএম/এমকেএইচ