সবুজ অরণ্যে আলী পেপারের থাবা

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি শ্রীপুর (গাজীপুর)
প্রকাশিত: ০৬:১৩ পিএম, ১৭ নভেম্বর ২০১৯

গাজীপুরের শ্রীপুরে আলী পেপার মিলের কালো ধোঁয়ায় বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। ভাওয়াল পরগণার শ্রীপুর উপজেলার টেংরা, সাইটালিয়া, সাতখামাইর, পেলাইদ ও তেলিহাটি মৌজার প্রায় হাজার একর জমি নিয়ে সমৃদ্ধ ছিল সাইটমনিগড় (স্থানীয় নাম)। সংরক্ষিত এই বনাঞ্চল ছিল বিভিন্ন প্রাণির অভয়াশ্রম। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদ। বর্তমানে এদের অনেক প্রজাতি হয় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিংবা বিলুপ্তির পথে। উপজেলা জুড়েই বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহের কারখানা ভাবা হত এই সংরক্ষিত বনকে। তবে আলী পেপার মিলসের বিষাক্ত ধোয়ায় বনের এই বিশুদ্ধ পরিবেশ এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

আলী পেপার মিলের কালো ধোঁয়ায় বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ, নষ্ট হয়ে গেছে আশপাশে গাছপালা, কমে গেছে পশুপাখির আনাগোনা। পরিবেশ হারাচ্ছে তার ভারসাম্য।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জৈনা বাজার থেকে পূর্ব দিকের ১৪ কিলোমিটারের পাঁকা সড়কটি বরমী বাজারে গিয়ে মিলেছে। সড়কটিতে ঢুকলেই দু’পাশের অসংখ্য সবুজ গাছগাছালির বিশুদ্ধ ঠাণ্ডা বাতাস ও পাখির কলরবে মন ছুঁয়ে যায়। তালতলী বাজার থেকে দরগারচালা পর্যন্ত ৫-৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়েই রয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে আলী পেপার মিল নামের কারখানাটি।

Ali-Paper

সেখানে কাগজ উৎপাদনে ব্যবহৃত বয়লারের কারণে সৃষ্টি হয় কালো ধোঁয়ার। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কারখানা হতে অনবরত বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া ও ছাই। এতে কারখানার আশপাশের গাছে মড়ক ধরেছে। কমে গেছে বন্য প্রাণি ও পাখির উপস্থিতি। সেই সঙ্গে কমেছে ফসল উৎপাদন। এতে কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকেই। কারখানার ছাই মিশে যাচ্ছে ঘাস, খড় ও ধানক্ষেতসহ গো খাদ্যে। ওইসব খাদ্য খেয়ে কয়েকজন কৃষকের গরু মারা গেছে।

সাইটালিয়া গ্রামের গৃহবধূ আমেনা আক্তার জানান, শুনছি কোনো এলাকায় মিল-কারখানা হলে নেই এলাকা উন্নত হয়। আর এই কারখানাটি আমাদের এলাকাকে ধ্বংস করছে। কারখানার কালো ধোঁয়া ও ছাই আমাদের ঘরে ঢুকে বিছানার চাদর ও ঘরের জিনিসপত্র নষ্ট হয়। ঠিক মত আমরা খাওয়া দাওয়া করতে পারি না।

তালতলী মুরগীর বাজার এলাকার কৃষক আব্দুল কাদের লাল মিয়া জানান, কারখানার ধোঁয়ার সঙ্গে নির্গত কালি আশপাশের ক্ষেত ও ফসলের ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে কোনো ধরনের সবজি চাষ করা যায় না। যখন ধোঁয়া ছাড়া হয় তখন ঠিক মতো নিঃশ্বাসও নেয়া যায় না। এছাড়াও ধোঁয়ার সঙ্গে ছাই বের হয়ে কয়েক কিলোমিটার এলাকা বিবর্ণ হয়ে গেছে। গবাদি পশুর খাবারও সংকট তৈরি হয়েছে।

Ali-Paper

তালতলী পূর্বপাড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘাসের ওপর কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত কেমিক্যাল ছড়িয়ে পড়ায় গবাদি পশুর জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঘাসের উপর জমে থাকা ছাই খেয়ে সম্প্রতি তার একটি গাভী মারা গেছে। এলাকার অনেক গবাদি পশু অসুস্থ হচ্ছে আলী পেপারের থাবায়। আশপাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য নাসির উদ্দিন জানান, এই পেপার মিলের কারণে কয়েক কিলোমিটার এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের। এক সময়ের সবুজ অরণ্য এখন বিবর্ণ হয়ে স্থানীয় পরিবেশ বিষাক্ত হয় পড়ছে কারখানা হতে নির্গত কালো ধোঁয়া ও বর্জ্যরে কারণে। আমরা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে জানালেও তারা কর্নপাত করেনি। তাই এখন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নোটিশ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

পেপার মিল থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও হাওয়াই বর্জ্য সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছাড়াও স্থাানীয় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে জানান শ্রীপুর ফরেস্ট বিভাগের রেঞ্জার আনিছুর রহমান। তিনি আরও জানান, বিষয়টি দেখার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদফতরের। আমরা তাদের বিষয়টি অবহিত করেছি।

Ali-Paper

গাজীপুর পরিবেশ অধিদফতরের গবেষণা কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে পরিবেশ ভারসাম্য হারাচ্ছে, আবার কেউ কৃত্রিম ভাবেও পরিবেশ ধ্বংস করছে। পরিবেশের উপর হুমকি তৈরি করা এই কারখানায় শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।

এ বিষয়ে কারখানার ব্যবস্থাপক অমিত সাহা জানান, বয়লার চালাতে গেলে ধোঁয়া হবেইঅ আর তুষ দিয়ে বয়লার চালানোয় ছাই সৃষ্টি হয়। তবে স্থানীয় কেউ বিষয়টি এখনও জানায়নি। তার দাবি কারখানাটি গড়ে তোলার জন্য খোদ পরিবেশ অধিদফতরই ছাড়পত্র দিয়েছে।

শিহাব খান/এমএমজেড/জেআইএম