শিক্ষার্থীদের মাঝে আলো ছড়াচ্ছেন দৃষ্টিহীন আব্দুল মালেক
কথাবার্তা শুনলে বা তাকে দেখলে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে তিনি চোখে দেখেন না। কারণ ঘর থেকে বের হয়ে তিনি একাই বাজার করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজ করেন। চলার পথে পরিচিত কেউ কথা বললে ঠিক চিনেও ফেলেন। পেশায় শিক্ষক আব্দুল মালেক ছৈয়াল একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। দক্ষতা, যোগ্যতা, বাচনভঙ্গি কোনো কিছুতেই কমতি নেই তার। তিনি যেমন জনপ্রিয় স্কুলে তেমনি এলাকাতেও।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাত বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন আব্দুল মালেক ছৈয়াল। তিনি নড়িয়া পৌরসভার বরুনপাড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত আব্দুল আজিজ ছৈয়ালের ছেলে।

পরিবার ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নড়িয়া পৌরসভার বরুনপাড়া এলাকায় ১৯৮৭ সালের ৭ জুন জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল মালেক। জন্মের সময় সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন। বছর তিনেক পর ১৯৯০ সালে টাইফয়েডে আক্রান্ত হন তিনি। দুই চোখের আলো হারান তখন। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে তাকে উন্নত চিকিৎসা দিয়ে আর সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি। ১৯৯২ সালে রাজধানীর একটি মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন। পরে ২০০৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে নড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
২০১০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং সেখান থেকেই ২০১৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৩ সালে বিভিন্ন স্থানে চাকরির আবেদন করতে থাকেন আব্দুল মালেক। ওই বছরই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদের জন্য আবেদন করেন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাকে নড়িয়ার কেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেন।

আব্দুল মালেক ল্যাপটপে রিডিং সফটওয়্যারের সাহায্যে বইয়ের বিষয়বস্তু শুনেন, আর শিক্ষার্থীদের পড়ান। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের সংগীতের ক্লাস নেন তিনি। শেখান হারমোনিয়াম ও তবলা বাজানো। নড়িয়া শিল্পকলা একাডেমির গানের শিক্ষকও তিনি। এতে দারুণ জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছেন শরীয়তপুরের এই শিক্ষক।
আব্দুল মালেক বলেন, আল্লাহ হাজারো শিশুকে আলোকিত করার দায়িত্ব আমার ওপর অর্পণ করেছেন। এ কাজটা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করতে চাই। শিক্ষকতার মতো একটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের সহায়তা ও ভালোবাসা পাচ্ছি।
আব্দুল মালেকের মা রোকেয়া বেগম বলেন, আমাদের দরিদ্র পরিবার। ছয় সন্তান নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হতো। এরই মধ্যে ২০০৬ সালে আমার স্বামী মারা যান। কিন্তু এত প্রতিকূলতার মধ্যেও মালেক দমে থাকেনি। অদম্য ইচ্ছে শক্তিই তাকে আজকের অবস্থানে এনেছে। পড়ালেখা করার সময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও সহপাঠীরা সহায়তা করত। আর পরীক্ষার সময় শ্রুতি লেখকের সহায়তা নিত। মালেক তার বিদ্যালয়ে অনেক জনপ্রিয়, এ দৃশ্য দেখলেই বুকটা গর্বে ভরে যায়। ২০১৩ সালে তাকে বিয়ে দেয়া হয়। তার পাঁচ বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে।

কেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিতা রায় বলেন, মালেক আমাদের বিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর আমরা কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু তিনি মেধা ও ইচ্ছা শক্তি দিয়ে শিশুদের মন জয় করেছেন। বিদ্যালয়ে তিনি অনেক জনপ্রিয় শিক্ষক।
শরীয়তপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, দৃষ্টিহীন মালেক অনেক দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক। নিজের চোখে আলো নেই, অথচ কত যত্ন নিয়ে শিশুদের মধ্যে আলো ছড়াচ্ছেন। বিদ্যালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে তিনি অনেক জনপ্রিয়। স্বল্প সময়ে তিনি এত ভালো করতে পারবেন তা ভাবতেও পারিনি।
ছগির হোসেন/আরএআর/এমএস