আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দিতে ২০ হাজার করে টাকা আদায়

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ০৩:৩৬ পিএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর ঘর নির্মাণে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিনামূল্যে এসব ঘর দেয়ার কথা থাকলেও ঘরপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় করেন সাতক্ষীরার তালা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার জাকির হোসেন।

এরপর ঘর দিলেও লাখ টাকা বরাদ্দের ঘরে দেয়া হয়েছে ৫০ হাজার টাকার মালামাল। বরাদ্দের টাকায়ও হয়েছে লুটপাট। এসব অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দফতরসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এলাকাবাসী।

২০১৭ সালের মে মাসে প্রকল্পটি প্রস্তাবিত হওয়ার পর ২০১৮ সালের মে মাসে অনুমোদন পায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কাজ সম্পন্ন হয়। প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরার তালা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে বরাদ্দ দেয়া হয় ৭৫২টি ঘর। এর মধ্যে তালা সদর ইউনিয়নে বরাদ্দ দেয়া হয় ২৫৮টি ঘর। ২৫৮টি ঘর নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

তালা সদর ইউনিয়নের মুড়াকলিয়া গ্রামের আসাদ মোড়ল। তিনি ইউপি চেয়ারম্যানকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে একটি ঘর পেয়েছেন। তবে ঘর পেলেও আক্ষেপ যায়নি তার। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অসহায় মানুষদের ঘর দিচ্ছেন শুনে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি ২০ হাজার টাকা দিলে একটি এক লাখ টাকার ঘর পাব। খানপুর গ্রামের মিকাইল সরদার চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সে টাকা উত্তোলনে সহায়তা করেছে। পরে আমি ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ঘর পেয়েছি। তবে ঘরে ৫০ হাজার টাকার মালামাল দিয়েছেন চেয়ারম্যান। ঘরের অর্ধেক মালামাল দেয়ার পর আমি বাকি মালামাল ক্রয় করে ঘরের নির্মাণকাজ শেষ করেছি।

একই গ্রামের সকিনা খাতুন বলেন, চেয়ারম্যান আমার কাছে ২০ হাজার টাকা চেয়েছিলেন, দিতে পারিনি বলে আমাকে ঘর দেননি। আমি অসহায় মানুষ।

জাতপুর গ্রামের গফুর ফকির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্থায়নে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় তালা সদর ইউনিয়নে ঘর নির্মাণকাজে চেয়ারম্যান নিজেই ঠিকাদার। লাখ টাকার ঘরে মালপত্র দিয়েছেন অর্ধেক। আবার ঘরপ্রতি ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। ঘর নির্মাণে কাজ করেছেন চেয়ারম্যানের আত্মীয়স্বজনরা। প্রধানমন্ত্রীর যে স্বপ্ন নিয়ে অসহায় মানুষদের ঘর দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন হয়নি।

খানপুর গ্রামের নাসিমা বেগম জানান, বিনা খরচে ঘর দেয়ার কথা থাকলেও ২০ হাজার টাকা দিয়ে ঘর পেয়েছি। মালামাল পেয়েছি অর্ধেক আবার যেটুকু দিয়েছে তাও নিম্নমানের। অসহায় মানুষদের সঙ্গে চেয়ারম্যানের এমন আচরণের জন্য শাস্তি দাবি করছি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ থেকে জানা গেছে, বরাদ্দের ২৫৮টি ঘরপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে উত্তোলন করে চেয়ারম্যান লুটে নিয়েছেন ৫১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। লাখ টাকা বরাদ্দের ২৫৮টি ঘরের ৫০ হাজার টাকার মালামাল দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সেখানে লুট করেছেন এক কোটি ২৯ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রীর এ আশ্রয়ণ প্রকল্পে এক কোটি ৮০ লাখ ৬০ হাজার টাকা লুটপাট করেছেন তিনি।

sat

চেয়ারম্যানের দুর্নীতি অনিয়মের এসব চিত্র তুলে ধরে তালা সদর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইয়াছিন সরদার বলেন, বরাদ্দ পাওয়ার পরই ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারদের নিয়ে মিটিংয়ে বসেন চেয়ারম্যান সরদার জাকির হোসেন। মেম্বারদের পাঁচটি করে ঘর দেয়া হবে বলে জানান চেয়ারম্যান। প্রত্যেকটি ঘরের জন্য দাবি করা হয় ২০ হাজার টাকা। আমার কাছে ৫টি ঘরের জন্য এক লাখ টাকা দাবি করেন চেয়ারম্যান।

তিনি আরও বলেন, আমি চেয়ারম্যানকে জানাই অসহায় মানুষ এতো টাকা দেবে কোত্থেকে থেকে? অসহায় মানুষদের কাছ থেকে ঘরের জন্য টাকা নেয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম আমি করতে পারবো না। পরে চেয়ারম্যান সরদার জাকির হোসেন তার ঘনিষ্ঠজন ও শ্যালককে দিয়ে ঘরপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করেন। চেয়ারম্যান নিজেই কাজের ঠিকাদার হন। পরিবহন খরচ ঠিকাদারের দেয়ার কথা থাকলেও সেই খরচ নেয়া হয়েছে অসহায় মানুষদের কাছ থেকে।

ইউপি সদস্য ইয়াছিন সরদার বলেন, এসব ঘটনায় চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দফতরে লিখিত অভিযোগ করেছে গ্রামবাসী। এছাড়া তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েও এসব অভিযোগের কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তালা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি সরদার জাকির হোসেন বলেন, প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ফ্রি এসেছিল, আমি ফ্রি দিয়েছি। আমি কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নেইনি।

তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আমার কাছে অভিযোগ এসেছে। তারা তাদের অভিযোগ জানিয়ে গেছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি।

তিনি বলেন, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক মহোদয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্ছার। কোনো দুর্নীতি অনিয়মই সহ্য করা হবে না।

আকরামুল ইসলাম/আরএআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]