৫০ বছর আগে মারা যাওয়া দাদার নামে মামলা, জেলে নাতি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ০৪:১২ পিএম, ১৪ মে ২০২০

মামলার এজাহার অনুযায়ী আসামির নাম মো. আব্দুল আজিজ মিয়া। যিনি মারা গেছেন ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু তার নামে এখন কারাগারে রয়েছেন তার নাতি আজিজুর রহমান।

এছাড়া মামলার বাদীও অপ্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু এজাহার যাচাই-বাছাই না করেই পুলিশ মামলাটি নথিভুক্ত করে সৌদি আরবফেরত আজিজুর রহমানকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের পাকশিমুল গ্রামে।

অভিযোগ উঠেছে, সরাইল থানা পুলিশের ওসি নাজমুল আহমেদ ও অরুয়াইল পুলিশ ক্যাম্পের উপপরিদর্শক (এসআই) হোসেন মো. কামরুজ্জামান বাদীপক্ষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে মামলাটি নথিভুক্ত করেছেন।

খোঁজ নিজে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পাকশিমুল বাজারে বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের ডিলারশিপ চালাচ্ছেন পাকশিমুল গ্রামের আবু সিদ্দিকের ছেলে আজিজুর রহমান। আর পাকশিমুল বাজারের পাশের অরুয়াইল ইউনিয়নের অরুয়াইল বাজারে ওরিয়ন ও সেনা এলপি গ্যাসের ডিলার পাকশিমুল ইউনিয়নের পরমানন্দপুর গ্রামের জিয়াউর আমিনের ছেলে মো. রিফাত মিয়া।

আজিজুর সৌদি আরবে চলে যাওয়ায় তার বাবা আবু সিদ্দিকই ডিলারশিপ চালান। কয়েক মাস আগে আজিজুর আবার দেশে ফিরে ব্যবসার হাল ধরেন। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী পাকশিমুল ও আশপাশের এলাকার ক্রেতাদের কাছে বসুন্ধরা গ্যাস সরবরাহ করবেন আজিজুর। আর যদি অন্য কেউ বসুন্ধরার গ্যাস বিক্রি করেন তাহলে আজিজুরের কাছ থেকে নিয়েই বিক্রি করতে হবে।

কিন্তু রিফাত বসুন্ধরার ডিলার না হয়েও অন্য জায়গা থেকে বসুন্ধরার গ্যাস কিনে এনে পাকশিমুল বাজার, অরুয়াইল বাজার ও আশপাশের এলাকায় বিক্রি করেন। অবৈধভাবে বসুন্ধরার গ্যাস বিক্রিতে নিষেধ করলে রিফাতের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় আজিজুরের।

২ মে সকালে বসুন্ধরার গ্যাস সিলিন্ডারভর্তি রিফাতের একটি গাড়ি পাকশিমুল বাজারে আটকে দেন আজিজুর ও তার বাবা সিদ্দিক। পরবর্তীতে পুলিশ এসে গ্যাসের সিলিন্ডারসহ গাড়িটি জব্দ করে অরুয়াইল ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বিষয়টি সমাধান করতে উভয়পক্ষকে ক্যাম্পে ডাকেন এসআই কামরুজ্জামান। কিন্তু সমাধান না করে আজিজুরকে আটক করে পুলিশ। পরবর্তীতে ওই দিনই রিফাতের ছোট ভাই মো. নোহাশ জিয়া বাদী হয়ে আজিজুরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেয়।

অপ্রাপ্তবয়স্ক নোহাশের মামলার এজাহারে আজিজুরের নাম লেখা হয়েছে মো. আ. আজিজ মিয়া। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম আজিজুর রহমান। আর বাবার নাম আবু সিদ্দিক। আ. আজিজ মিয়া হলো আজিজুরের দাদার নাম। যিনি ৫০ বছরের বেশি সময় আগে মারা গেছেন। যদিও এজাহারে আসামির বাবার নাম হাজি আবু সিদ্দিক উল্লেখ করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ মামলার বাদী হতে পারে না। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বলেছেন, নোহাশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। তার বয়স এখনও ১৮ বছর হয়নি। যদিও এজাহারে নোহাশের বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।

আজিজুরের বাবা আবু সিদ্দিক বলেন, বসুন্ধরার ডিলার না হয়েও রিফাত অবৈধভাবে বসুন্ধরার গ্যাস বিক্রি করে। এতে করে আমরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। রিফাতকে নিষেধ করলেও সে শোনেনি। উল্টো তার নাবালক ভাইকে দিয়ে আমার ছেলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দিয়েছে। আমরার ছেলে সৌদি আরবে ব্যবসা করতো। সে গ্রামে অনেক দান-দক্ষিণা করে। অথচ তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেয়া হয়েছে। পুলিশ টাকা খেয়ে আমার ছেলের সম্পর্কে যাচাই না করেই মামলা নিয়েছে। কিছু না করেও আমার ছেলে এখন জেলে।

পাকশিমুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, আজিজুরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা। সে এলাকায় গরিব-অসহায় ও মসজিদ-মাদরাসায় অনেক দান করে। গ্যাসের ডিলারশিপ নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে চাঁদাবাজির মামলার আসামি হতে হয়েছে তাকে। ঘটনাটি সমাধানের জন্য পুলিশ ক্যাম্পে আমাকে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু সমাধান না করে আজিজুরকে আটক করা হয় তখন। আর মামলার বাদী নোহাশকে আমি খুব ভালো করে চিনি। তার বয়স ১৩-১৪ বছর। পুলিশ যাচাই না করেই মামলা নিয়েছে।

মামলার বাদী মো. নোহাশ জিয়ার বড় ভাই গ্যাসের ডিলার মো. রিফাত মিয়া বলেন, ব্যবসায়িক প্রতিহিংসা থেকে প্রায়ই আমাকে হেনস্তা করতো আজিজুর। আমার সিলিন্ডার গ্যাস যখন তার এলাকা দিয়ে প্রবেশ করতো তখন লোকজন দিয়ে আটকে রাখতো। পরে চাঁদা দাবি করতো।

সরাইল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল আহমেদ বলেন, আজিজুর রহমানকে ওখানে সবাই আজিজ বলে ডাকেন। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। বাদীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলা হয়েছে। তবে টাকার বিনিময়ে মামলা নথিভুক্ত করার অভিযোগ সত্য নয়।

আজিজুল সঞ্চয়/এএম/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।