‘২৫ দিন থাকি ঘরের চালত আছি বাহে’
‘২৫ দিন থাকি ঘরের চালত আছি বাহে, কাঁইয়ো এ্যালাও দেইকপের (খোঁজখবর) আসিল ন্যা। খেয়া না খেয়া কোনোমতে বাঁচি আছি। তোমরাগুইলা ছবি তুলি কি করেন বাহে। গরিবের কাঁইয়ো নাই’।
এভাবে কথাগুলো বলেছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভের খাষ ইউনিয়নের কালার চর এলাকার বন্যাদুর্গত জসিম উদ্দিনের স্ত্রী চার সন্তানের জননী শাহিনুর বেগম। প্রথম দফার বন্যার শুরুতে একমাত্র ছাপরা (কুঁড়ে) ঘরে বন্যার পানি ওঠে। প্রথম দিকে সেখানে থাকার চেষ্টা করলেও পানি বেশি হওয়ায় স্বামী, চার সন্তান, হাঁড়ি-পাতিল, চুলা, কাপড়-চোপড়সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ছাপরা ঘরের চালে আশ্রয় নেন।
সেখানে পলিথিনের একটি ছাউনি তৈরি করে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেন তারা। ছাউনিতে রাত-দিন বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে থাকতে হয় তাদের। বাড়ির নলকূপ, টয়লেট আগেই ডুবে গেছে বন্যার পানিতে। ফলে পানি এবং পয়োনিষ্কাশনের জন্য কলার ভেলায় অন্যত্র যেতে হয় তাদের। রয়েছে রান্নার কষ্টও। মিলছে না ঠিকমতো খাবার।
শাহিনুর বেগমের স্বামী জসিম উদ্দিন বলেন, কাজকর্ম না থাকায় আয় নেই। এখন পানিবন্দি অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের নিয়ে দিন পার করছি। এ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো সহযোগিতা পাইনি।
একই ইউনিয়নের চরকাচারি পাড়ার মাজিয়া বেগম এক মাস ধরে বাড়ি ছেড়ে প্রতিবেশীর উঁচু ভিটায় পলিথিনের ছাউনিতে আছেন। তার স্বামী শহিদুল ইসলাম পেশায় বর্গাচাষি। এবার বর্গা নিয়ে চার বিঘা জমিতে কাউন বুনেছিলেন তিনি। বন্যার শুরুতে এক বিঘা কাটতে পারলেও তিন বিঘা ক্ষেতের কাউন পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যায় তিন সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে।
মাজিয়া বেগম বলেন, কোনও রকমে এক বেলা খেয়ে দিন পার করছি। এক মাস পানিবন্দি অবস্থায় থাকার পরও কোনো ত্রাণ সহযোগিতা পাইনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই দুই পরিবার স্থানীয় ভোটার না হওয়ায় ত্রাণ পাচ্ছে না। শাহিনুর বেগমের পরিবার কর্মের খাতিরে অন্য জেলায় অবস্থান করায় সেখানকার ভোটার হন। পরে তারা কয়েক বছর হলো এখানে বসবাস করছেন। মাজিয়া বেগম নদী ভাঙনের শিকার হয়ে অন্য ইউনিয়ন থেকে বল্লভের খাষ ইউনিয়নের বাসিন্দা হন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এরকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে অনেক বানভাসি পরিবারকে। যদিও এসব পরিবার দীর্ঘদিন এই ইউনিয়নে বসবাস করছেন।
বল্লভের খাষ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আকমল হোসেন বলেন, ভোটার আইডি কার্ড দেখে তালিকা প্রস্তুত করে থাকি। সেক্ষেত্রে তাদের নাম হয়তো আসেনি। তারপরও আমার ইউনিয়নে যেহেতু তারা বাস করে তাদের সহযোগিতা করা হবে।
এ বিষয়ে নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূর আহমেদ মাছুম বলেন, স্থানীয় ভোটার না হলে ত্রাণ দেয়ার ক্ষেত্রে একটু সমস্যা আছে। ত্রাণ দেয়ার মাস্টার-রোল আমাদেরকে জেলায় জমা দিতে হয়। তবে যেহেতু তারা বন্যায় দুর্গত হয়ে পড়েছে তাদেরকে অন্য কোনও উপায়ে সহযোগিতা করা হবে।
নাজমুল/এএম/পিআর