এবার মামলা করলেন ইউএনও

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বরগুনা
প্রকাশিত: ০৬:০৩ পিএম, ১০ আগস্ট ২০২০

বরগুনার আমতলী পৌর যুবলীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য আইনজীবী আরিফুল হাসান আরিফসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১২ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে আমতলী থানায় সরকারি কাজে বাধা, হত্যাচেষ্টা ও শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ এনে মামলাটি করেছেন আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা পারভীন।

মামলায় আরিফ ও তার সহকারী রায়হানকে গ্রেফতারের পর আদালতে হাজির করা হলে সন্ধ্যায় দুজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। জেলা আইনজীবী সমিতি এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে আরিফের মুক্তি দাবি করেছে।

এছাড়া এ মামলায় ঢাকা আমতলী রুটে চলাচলরত এম ভি সুন্দরবন-০৭ লঞ্চের সুপারভাইজার মো. মইনুলসহ (৪২) অজ্ঞাত আরও ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে ইউএনও মনিরা পারভীন অভিযোগ করেন, শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুর দেড়টার দিকে সাধারণ যাত্রীদের মাঝে মাস্ক বিতরণের পাশাপাশি লঞ্চে যাতে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন না হয় সে বিষয়ে সরকারি দায়িত্বপালন করতে আমতলী লঞ্চঘাটে যান তিনি। এ সময় তিনি আমতলী থেকে ঢাকাগামী সুন্দরবন-০৭ লঞ্চে ধারণক্ষমতার চারগুণ বেশি যাত্রীবোঝাই দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আর কোনো যাত্রী লঞ্চে না উঠিয়ে লঞ্চ ছেড়ে দেয়ার জন্য লঞ্চের সুপারভাইজার মো. মইনুলকে নির্দেশ দেন। সুপারভাইজার মইনুল তার নির্দেশ অমান্য করে লঞ্চে যাত্রী ওঠাতে থাকেন এবং কেবিনের যাত্রী রয়ে গেছে বলে অপেক্ষা করেন।

এ সময় ইউএনও মনিরা পারভীন পুনরায় সুপারভাইজার মো. মইনুলকে লঞ্চ ছাড়ার কথা বললে তার সঙ্গে মইনুল অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং তার নির্দেশ অমান্য করেন। পরে মইনুলের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমতলীর আইনজীবী ও জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফুল হাসান এবং তার সহকারী মো. রায়হান পাশে থাকা একটি টেবিল ভেঙে ফেলেন এবং ইউএনও মনিরা পারভীনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এতে তিনি পায়ে এবং কোমরে আঘাতপ্রাপ্ত হন। এ সময় আমতলী থানায় খবর দিলে পুলিশ আইনজীবী আরিফ উল হাসান এবং তার সহকারী মো. রায়হানকে আটক করে থানায় নিয়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় সেদিনের ঘটনা

জহুরা বেগম বয়োবৃদ্ধ একজন নারী। তিনি লঞ্চে রান্নার কাজ করে ফিরছিলেন। ঘাটে দাঁড়ানো ইউএনও তাকে দেখেই চড়াও হয়ে বলেন- ‘এই বেটি তুই কই যাস, ভাগ এখান থেকে, যত্তসব’ বলছিলেন জহুরা।

তিনি বলেন, আমি ফিরছিলাম তখন আরিফ ও রায়হান লঞ্চ থেকে নেমে ঘাটে এসে ইউএনওকে দেখে সালাম দেন। ইউএনও জবাব না দিয়ে উল্টো আরিফের সঙ্গে তর্কে জড়ান ও এমন বাজেভাবে গালিগালাজ করেন যা আমি মুখে বলতে পারবো না।

জহুরা বেগম বলেন, আরিফকে পুলিশ দিয়ে আটক করিয়ে ইউএনও ম্যাডাম গালি দিতে দিতে ধাক্কা মেরে সামনের দিকে নিয়ে যান।

সেখানে উপস্থিত আমতলী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর বশির উদ্দীন হাওলাদার বলেন, ইউএনও লঞ্চঘাটে উপস্থিত হয়ে ঘাট আটকে দেন। তিনি কাউকে লঞ্চে উঠতে নিষেধ করেন। কয়েকজন কেবিনের যাত্রী লঞ্চে উঠতে না পারায় তারা ইউএনওকে অনুরোধ করেন। ইউএনও কয়েকজনকে লঞ্চে ওঠার অনুমতি দিলেও লঞ্চ থেকে ঘাটে ফেরা কয়েকজনের ওপর চড়াও হন এবং সুপারভাইজারকে ডেকে দ্রুত লঞ্চটি ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, আরিফ লঞ্চে যাত্রী উঠিয়ে ফিরছিলেন, ইউএনও আরিফকে দেখেই চড়াও হয়ে নাম উল্লেখ করে বলেন, তুই আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করিস, সংবাদ সম্মেলন করিস! তোর এতো সাহস। সঙ্গে থাকা পুলিশকে আরিফকে আটক করার নির্দেশ দেন ইউএনও।

এরপর পুলিশ কিছুটা বিব্রতবোধ করলেও পরে তিনি পুলিশের ওপরও চড়াও হন। পুলিশ আরিফ ও রায়হানকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় ইউএনও জানোয়ারসহ নানা অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিতে দিতে পেছন থেকে দুবার ধাক্কা দেন। আমরা ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।

uno2

একই বক্তব্য লঞ্চঘাটের বেশ কয়েকজন দোকানদারেরও। তারা জানান, আরিফের প্রতি ইউএনও আগে থেকেই কোনো কারণে হয়তো ক্ষুব্ধ ছিলেন, নয়ত এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার কথা নয়।

এদিকে এ মামলাকে ক্ষমতার অপব্যবহার, ‘ষড়যন্ত্রমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবিত’ মামলা বলে উল্লেখ করে অ্যাডভোকেট আরিফুল হাসানের মুক্তির দাবিতে মিছিল করেছে স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের একটি অংশ। এছাড়া জেলা যুবলীগসহ ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ সংগঠনের ব্যানারে আরিফুল হাসানের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন পেশাজীবী নেতারাও।

এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, অ্যাডভোকেট আরিফুল হাসান সম্পূর্ণ নির্দোষ। স্থানীয় রাজনীতির একটি পক্ষের চক্রান্তের শিকার তিনি। মামলায় যে ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সে ঘটনার ভিডিওচিত্র আমরা দেখেছি। তাতে আরিফের কোনো ত্রুটি আমরা দেখিনি। বরং ইউএনও মনিরা পারভীন তাকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজসহ মারমুখী অবস্থায় ছিলেন। এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়।

এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট আরিফুল হাসানের বাবা আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার অ্যাডভোকেট এমএ কাদের মিয়া জানান, তার ছেলে নির্দোষ। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। আরিফ তার এক বন্ধুকে গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আমতলী লঞ্চে এগিয়ে দিতে গেলে ইউএনওর সঙ্গে দেখা হয়। এসময় সে ইউএনওকে ছালাম দেয়। ইউএনও ছালাম না নিয়ে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করিস’ একপর্যায়ে আরিফকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন ইউএনও মনিরা পারভীন। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডা হলে ইউএনও তাকে পুলিশে সোপর্দ করেন।

তিনি বলেন, আমরা ন্যায়বিচারের জন্য যাদের কাছে যাবো তারাই যদি এমন প্রভাবিত হয়ে মিথ্যা মামলা করেন তখন আমাদের আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না।।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা পারভীন বলেন, আমার ওপর হামলা হয়েছে। আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ন্যায়বিচারের জন্য মামলা করেছি। আমি চাইলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মোবাইল কোর্টে তাদের সাজা দিতে পারতাম। আমার ওপর হামলার ঘটনায় আমি ন্যায়বিচার প্রার্থনা করি।

এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘আমি জেনেছি ইউএনও মনিরা পারভীনকে সরকারি কাজে বাধা দেয়া হয়েছে। তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়েছে এবং তাকে আহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় ইউএনও ব্যক্তিগতভাবে আমতলী থানায় মামলা করেছেন। একজন ইউএনওর সঙ্গ এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তা অপরাধ। বিষয়টি আমরাও খতিয়ে দেখছি।’

সাইফুল ইসলাম মিরাজ/আরএআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]