২১ আগস্ট বাবাকে হারিয়েছি, তখন কিছুই বুঝিনি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মাদারীপুর
প্রকাশিত: ০৬:২৭ পিএম, ২১ আগস্ট ২০২০
বামে প্রধানমন্ত্রীর কোলে গ্রেনেড হামলায় নিহত লিটনের মেয়ে মিথিলা

‘আমার প্রথম জন্মদিন ছিলো ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর। মায়ের মুখে শুনেছি বাবা ঢাকা থেকে নতুন জামা নিয়ে আসবে। নতুন পোশাক পরে ধুমধাম করে আমার প্রথম জন্মবার্ষিকী পালন করা হবে। কিন্তু বাবা আর ফিরে আসেননি। ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় আমার বাবা মারা যান। তখন কিছুই বুঝিনি। আস্তে আস্তে বড় হওয়ার পর সব বুঝতে পেরেছি। এ বছর ১ সেপ্টেম্বর আমার ১৬ বছর পূর্ণ হবে। কিন্তু এতো বছর পার হলেও বাবাসহ সেদিনের হামলায় জড়িতদের বিচারের রায় এখনও কার্যকর হয়নি।’

কথাগুলো বলছিল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চানপট্টি গ্রামের যুবলীগ নেতা লিটন মুন্সির মেয়ে নুসরাত জাহান মিথিলা।

শুধু মিথিলা নয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শেখ হাসিনার সমাবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় মাদারীপুরের নিহত চার পরিবারসহ আহত তিনজনের পরিবারের সদস্যরা ভালো নেই। আহতরা পঙ্গুত্ব নিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় মাদারীপুরের নিহত চারজন হলেন- রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চানপট্টি গ্রামের যুবলীগ নেতা লিটন মুন্সি, একই উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের মহিষমারি গ্রামের সুফিয়া বেগম, কালকিনি উপজেলার কয়ারিয়া ইউনিয়নের রামারপোল গ্রামের নাছিরউদ্দিন ও ক্রোকিরচর গ্রামের যুবলীগ নেতা মোস্তাক আহাম্মেদ ওরফে কালা সেন্টু।

আহতরা হলেন- কালকিনি পৌরসভার বিভাগদি গ্রামের হালান হাওলাদার, কৃষ্ণনগর গ্রামের কবির হোসেন ও ঝাউতলা গ্রামের সাইদুল হক সরদার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চানপট্টি গ্রামের নিহত যুবলীগ নেতা লিটন মুন্সির মা আছিয়া বেগম ও বাবা আইয়ুব আলী মুন্সি তাদের একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহত যুবলীগ নেতা লিটন মুন্সির মেয়ে নুসরাত জাহান মিথিলা প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে ভাতা পায়। এছাড়াও ঢাকার মিরপুরে একটি ফ্ল্যাট বাসা ও ২০১৮ সালের রোজার সময় ৫ লাখ টাকা সরকারিভাবে পেয়েছে।

নুসরাত জাহান মিথিলা বলে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় যখন আমার বাবা মারা যায় তখন আমি খুবই ছোট ছিলাম। বাবা কি জিনিস তা বুঝতে পারি নাই। বাবার আদর পাওয়ার আগেই বাবাকে হারিয়েছি। হামলার ঘটনায় অপরাধীদের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাই। তাহলে এই ঘটনায় আমার বাবাসহ যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের আত্মা শান্তি পাবে।

আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। লেখাপড়া শেষে আমি যেন একটা সরকারি চাকরি পেতে পারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এ দাবি জানাই।

নিহত নাসিরের বড় ছেলে মাহাবুব হোসেন (২২) বলেন, বাবার উপার্জনেই চলতো সংসার। বাবার মৃত্যুর পর টাকার অভাবে আমাদের লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনোদিন অর্ধপেট আবার কোনোদিন খাবারই জোটেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন। এখন সেই টাকার লভ্যাংশ দিয়ে আমার মা, আমি আর আমার ভাই নাজমুলকে নিয়ে কোনো রকম বেঁচে আছি। এ ছাড়াও আমাদের খবর আর কেউ রাখেনি।

গ্রেনেড হামালায় নিহত যুবলীগ নেতা মোস্তাক আহাম্মেদ ওরফে কালা সেন্টুর বাড়ি কালকিনি উপজেলার ক্রোকিরচর। তিনি বরিশালের মুলাদি নানা বাড়িতে বড় হয়েছেন। এ কারণে তার লাশ মুলাদিতেই দাফন করা হয়।

কথা হয় সেন্টুর স্ত্রী আইরিন সুলতানার সঙ্গে। তিনি ঢাকায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকে চাকরি করেন। এক মেয়ে আফসানা আহমেদ রীদিকে নিয়ে সেখানেই থাকেন। তিনি বলেন, এমন দুঃখজনক স্মৃতি কি ভোলা যায়? মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় থাকি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকার অনুদান পেয়েছিলাম। সে সম্বল আর চাকরি থেকে যা পাই, তা দিয়েই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভাবছি। প্রধানমন্ত্রী যদি একটা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতেন তাহলে উপকৃত হতাম।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত হালান হাওলাদার বলেন, শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর পরিমাণ স্প্লিন্টার রয়েছে। স্প্লিন্টারের জ্বালা-যন্ত্রণা অসহ্য লাগে মাঝে মাঝে। হাঁটাচলা করতে খুব কষ্ট হয়। সে কারণে তেমন কাজ করতে পারি না। তারপরও সংসারের খরচ মেটানোর জন্য ফেরি করে মুরগি বিক্রি করি। করোনার কারণে এখন তা বন্ধ আছে। আমরা যারা আহত আছি প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন তাহলে ভালো হতো। আহত অনেকে বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট থেকে প্রতি মাসে ভাতা পায়। আমি ভাতা পাই না। প্রধানমন্ত্রী যেন আমাদের কালকিনির আহত তিনজনের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেন। আহত অনেকে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ফ্ল্যাট পেয়েছে। আমি ফ্ল্যাট পাইনি। আমার থাকার জন্য স্থায়ী বসতঘরের প্রয়োজন।

আহত আরেকজন কবির হোসেন বলেন, গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হয়ে বাম হাতের ৫ আঙ্গুল বাকা হয়ে আছে। এ হাত দিয়ে কোনো ভারি কাজ করতে পারি না। দুইবার আমি মাত্র এক লাখ ২০ হাজার টাকা পেয়েছি। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে যে টাকা দিয়েছে আমি সে টাকা পাইনি।

তখন আমি টাকা রোজগারের জন্য মালয়েশিয়া ছিলাম। বিদেশে গিয়েও হাতের সমস্যার কারণে তেমন কাজ করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে কয়েক মাস আগে দেশে চলে এসেছি। এখন বেকার জীবনযাপন করছি। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে যে এককালীন টাকা দিয়েছেন আমাকেও যেন সে টাকা দেন। প্রতিমাসে যেন ভাতার ব্যবস্থা করেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাই।

কালকিনির ঝাউতলা গ্রামের সেদিন আহত সাইদুল হক সরদার বলেন, সেদিন শেখ হাসিনাকে দেখার জন্য আস্তে আস্তে মঞ্চের ১০ থেকে ১২ হাত কাছে চলে গিয়েছিলাম। দাঁড়িয়ে মন দিয়ে নেত্রীর বক্তব্য শুনতে শুনছিলাম। বক্তব্য প্রায় শেষ। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু শেষ করতে পারিনি তার মধ্যে বোমা বিস্ফোরণের শব্দ। সে ঘটনায় আহত হয়ে শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে যন্ত্রণাকর জীবনযাপন করছি। শরীরে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় তেমন ভারি কাজ করতে পারছি না। ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তার বলে উন্নত চিকিৎসা দরকার। আমি উন্নত চিকিৎসা কীভাবে করবো। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই তিনি যেন আমাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

একেএম নাসিরুল হক/আরএআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]