একই পথে তিন প্রজন্ম, আজও বাড়ি অন্যের জমিতে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৯:৪৮ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০২০

এক পুরুষে করে ধন, এক পুরুষে খায়। আর এক পুরুষ এসে দেখে খাওয়ার কিছু নাই। আমার তিন পুরুষ, তিন পুরুষ আমার তিন পুরুষ। জনপ্রিয় এ গানটি প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর। বর্তমান যুগে গানের এ কথাগুলো মিলে যায় আমাদের চারপাশের অনেকের সঙ্গে।

আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে যাচ্ছে, কিন্তু আজও তারা তিনবেলা পেট ভরে খাবার খেতে পারছেন না। তেমনি একজন মুকিদ মিয়া (২৭)। তার দাদা ছিলেন দিনমজুর। এরপর একই পেশায় নামেন বাবাও। সারাজীবন দিনমজুরি করেও নিজের মাথা রাখার মতো একটু ভিটেও নেই তাদের। একই পথে ছুটছে এখন মুকিদও। তবে তিনি এখন সিএনজি চালান।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কনকপুর ইউনিয়নের কনকপুর এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের পাশেই ছোট্ট একটি কুঁড়ে ঘরে বসবাস মুকিদ মিয়ার।

মাত্র ৩ মাস বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। মায়ের কাছে জেনেছেন দিনমজুর বাবার সারা জীবন কেটেছে সংসারের গ্লানি টানতে। তিন ভাইয়ের ছোট মুকিদ মিয়ার বয়স যখন ৮ বছর তখন বড় দুই ভাই ১৫ এবং ২০ বছর বয়সে যে যার মতো বাড়ি ছেড়ে চলে যান।

মায়ের সঙ্গে থেকে যান ছোট শিশু মুকিদ মিয়া। মা-ছেলের সংসার চালাতে সেই শিশুটি মৌলভীবাজার শহরের একটি চায়ের দোকানে কাজ নেন দৈনিক ১৫ টাকা মজুরিতে। এ টাকায় চলতো তাদের মা-ছেলের সংসার। এভাবেই কেটে যায় কয়েক বছর।

এখন মুকিদ মিয়ার বয়স ২৭ বছর। বিয়েও করেছেন। একটা ছেলেও আছে তার। ৩ পুরুষ দিনমজুরি করলেও ভাগ্য পরিবর্তন না হওয়া মুকিদ মিয়া এখন স্বপ্ন দেখেন ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ বানানোর।

জাগো নিউজের সঙ্গে নিজের কষ্ট আর স্বপ্ন নিয়ে কথা বলেছেন মুকিদ মিয়া। তিনি জানান, বাবা কুরবান মিয়া মারা যাওয়ার সময় তার বয়স ছিল ৩ মাস। তাই বাবার আদর জুটেনি তার। মা অনেক কষ্ট করে বড় করেছেন তাকে। মায়ের কষ্টের সেই কথা বলতে গিয়ে চোখে পানি চলে আসে মুকিদের।

jagonews24

তিনি জানান, ৮ বছর বয়সে চায়ের দোকানে যখন কাজ করতাম অনেক বাবা তখন তাদের স্কুলগামী সন্তান নিয়ে দোকানে আসতো। তাদের সন্তানদের হাতে বই খাতা দেখে খুব ইচ্ছে করতো স্কুলে যাওয়া। কিন্তু উপায় ছিল না। ওই বয়সে কেউ একটি চকলেটও ভালোবেসে দেয়নি।

১২ বছর বয়সে টেম্পু, বেবি ট্যাক্সির ওয়ার্কসপে ঢুকি। সেখানে ৫ টাকা বেতন বেশি। দৈনিক ২০ টাকা পেতাম। পরে জানলাম দিনমজুরের কাজ করলে বেশি টাকা পাওয়া যায়। এরপর শুরু করলাম দিনমজুরের কাজ।

তিনি বলেন, আমাদের যেখানে বাড়ি, সেটির নদীর জায়গার উপর। জানি না, এ জীবনে কখনও কোনো জমির মালিক হতে পারবো কিনা?

৩ বছর আগে আমার কষ্ট দেখে স্থানীয় সিএনজি অটোরিকশা চালক সোহাগ মিয়া আমাকে সিএনজি চালানো শিখতে বললেন। কিন্তু সিএনজি চালানো শিখতে গেলে যে আমার আয় বন্ধ হয়ে যাবে। এই ভেবে না করেছিলাম। এটা জেনে সোহাগ মিয়া বললেন, তিনি আমার সংসার চালাবেন যতদিন শিখতে গিয়ে আমার আয় বন্ধ থাকে, ততদিন। অবশেষে সিএনজি চালানো শিখি।

মুকিদ বলেন, ছোটবেলায় আমি যে কষ্ট করেছি তা যেন কোনো শিশুর জীবনে না আসে। আমার একটি ১ বছরের ছেলে রয়েছে। তাকে আমি যেভাবেই হোক লেখাপড়া শেখাবো। বাপ-দাদা যা করে গেছেন আমিও তাই করছি। কিন্ত কোনো উন্নতি নেই। আশা করছি আমার ছেলে লেখাপড়া করে মানুষ হবে। আল্লাহর কাছে এটাই চাই।

মুকিদ মিয়াকে সিএনজি চালাতে সহযোগিতা করা সোহাগ মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, মূলত তার অভাব অনটন দেখে আমার কষ্ট লেগেছিল। তাই বলেছিলাম সিএনজি চালানো শিখতে। এখন সে সিএনজি চালায়। এতে কষ্ট কম হয়। দিনমজুরিতে অনেক কষ্ট। যদিও আমি এভাবে ২৫ জনকে এখন পর্যন্ত সিএনজি চালানো শিখিয়েছি। তারা সবাই ভালো আছে।

মুকিদের প্রশংসা করে স্থানীয় ইউপি সদস্য হান্নান মিয়া বলেন, সে সৎ এবং পরিশ্রমী। একদিন হয়তো আল্লাহ তার অবস্থান পরিবর্তন করবেন। হয়তো নিজের একটা ভিটেও হবে তার।

রিপন দে/এমএএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]