ছোট্ট হাতে বড় হাল ধরার চেষ্টা সোহেলের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ১১:১৬ এএম, ২৪ ডিসেম্বর ২০২০

ছোট হাতে বড় সংসারের হাল ধরতে ব্যস্ত সোহেল (১০)। লেখাপড়া ঘুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণিতে। ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী বাবার আয়ের যোগান দিতে।

শিশু সোহেলের বাবা একজন কাঠমিস্ত্রী। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কাজ করাই তার পেশা। রোজগার হলেই জ্বলে চুলা। বিশ্ব মহামারি করোনায় দীর্ঘ কয়েক মাস স্কুল বন্ধ থাকায় প্রায়ই সোহেলকে দেখা যায় বিভিন্ন খেত খামার অথবা সুপারি গাছের আঁগায়। ওই কাজে পাওয়া টাকা সে তুলে দেয় মা-বাবার হাতে।

সোহেল টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার গয়হাটা ইউনিয়নের ঘুনি গ্রামের আলতাফ হোসেনের ছেলে। আলতাফ হোসেনের দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। সবাই স্কুলে পড়ে। সংসারের খরচসহ সন্তানদের স্কুলের খরচ যোগাতে হিমসিম খান কাঠমিস্ত্রি আলতাফ।

নিজের বলতে এক চিলতে জমিতে একটি টিনের ঘর ছাড়া কিছুই নেই তার। অস্বচ্ছল সংসারের অভাব অনটন ঘুচাতে সুযোগ পেলেই দিক বেদিক ছুটে যায় সোহেল।

মাঠে ধান সংগ্রহ করতে আসা শিশু সোহেল জানায়, বিভিন্ন মাঠে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করি। আবার কখনও কচুর মুখি তুলে, কখনও গাছ থেকে চুক্তিতে সুপারি পেড়ে যা পাই সব মায়ের কাছে দিই।

বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের জন্য, তাই বসে না থেকে তাকে সাহায্য করতে আমি এভাবেই উপার্জন করি। পড়ালেখা করে বড় হয়ে মা বাবার পাশে দাঁড়াবে বলেও জানায় সোহেল।

সরেজমিনে দেখা গেল, ফসলের মাঠে ঝরে পড়া ও ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহের আনন্দে মেতেছে হতদরিদ্র শিশুরা। এরকম পাঁচ-ছয় জন শিশু আছে এলাকায়। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ থেকে কৃষকরা ধান নিয়ে যাওয়ার পর একদল শিশু-কিশোর হাতে খুন্তি-শাবল, চালন, ব্যাগ নিয়ে খুঁজে ফিরছে ইঁদুরের গর্ত। ইঁদুরের গর্তে জমানো ধান ব্যাগে ভরে তারা। এছাড়া জমিতে পড়ে থাকা ধানও কুড়িয়ে ব্যাগে ভরতে দেখা গেল তাদের।

jagonews24

এমন সময় দেখা মেলে শিশু সোহেলের। ঠিকানা নিয়ে ও বাড়িতে গিয়ে কথা হয় পরিবার ও আশপাশের লোকজনের সাথে।

প্রতি বছর ধান কাটা শেষ হতেই ঝরে পড়া ধান কুড়াতে ব্যস্ত সময় পার করে একদল শিশু-কিশোর এমনকি বৃদ্ধারাও। এই ধান সংগ্রহ করে কেউ যোগায় সংসারের খোরাক। কেউ আবার এ ধান বিক্রি করে কেনে শার্ট, প্যান্ট, জুতাসহ শীতের পোশাক। আবার কেউ খায় শীতের পিঠা।

ঘুনি গ্রামের কৃষক আঞ্জু মিয়া জানান, ধান কাটার পর মাটিতে পড়ে থাকা ধান শিশু-কিশোররা সংগ্রহ করে। এতে আমরা বাঁধা দিই না। গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরাই দল বেঁধে ধান সংগ্রহ করে। তবে গর্তে বিষাক্ত সাপ থাকতে পারে বলে তাদের সাবধান করি।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানায়, চলতি মৌসুমে ধান কাটা ও মাড়াই চলছে। এবার ধানের দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। এক মণ ধান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১শ থেকে ১২শ টাকায়।

এ বছর উপজেলায় ২ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন ধান। প্রবল বন্যার কারণে ধান রোপণ এবং কর্তন সব দিকেই পিছিয়ে আছেন কৃষকরা।

নাগরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিন বিশ্বাস জানান, ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করা অনিরাপদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আধুনিক লগো পদ্ধতিতে ১০ লাইন পরপর এক লাইন গ্যাপ দিয়ে ধান রোপণ করলে ইঁদুর ধান নষ্ট কম করে। এ পদ্ধতিতে খেতে আলো চলাচলের সুযোগ পায়। এতে ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরিফ উর রহমান টগর/এফএ/এমকেএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।