শীতে অসহায় চরের পরিযায়ী শ্রমিকরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মুন্সিগঞ্জ
প্রকাশিত: ১২:৪৬ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০২১

‘হাতলা (পাতলা) কম্বলে শীত মানে না বাজান। এবার একখান কম্বল পাছু। তা দিয়া শীত কাটে না। যদি কায়ো (কেউ) কম্বল দিবার চায় তাক কন (বলেন), য্যান ভাল একখান কম্বল দেয়।’ নেত্রকোনার স্থানীয় ভাষায় এভাবেই শীতবস্ত্রের জন্য আকুতি করছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক খুদেজা বেগম (৬০)।

সরেজমিন দেখা যায়, মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার দিঘীরপাড় চরাঞ্চলে অস্থায়ী শতাধিক খড়ের ঘর। সেখানকার অধিকাংশ বাসিন্দা নেত্রকোনা জেলার। এছাড়া রংপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর ও কুড়িগ্রামের মানুষও রয়েছে। তারা মুন্সিগঞ্জে আলু রোপণ ও উত্তোলনসহ কৃষিকাজ করতে এসেছেন। কাজের সন্ধানে মৌসুম শেষে আরেক জেলায় চলে যাবেন তারা।

পরিযায়ী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা প্রতিবছর আলু রোপণের সময় এই জেলায় আসেন। জমি পরিচর্যাসহ অন্যান্য কৃষিকাজ করে থাকেন। আলু তোলা শেষ হলে নিজ জেলায় ফিরে যান। এতে শীতের পুরোটা সময় খড়ের ঘরে বসবাস করতে হয়।

jagonews24

তাদেরই একজন খুদেজা বেগম। অসুস্থ স্বামী তারা মিয়া (৭০), নাতনি লিজা মনি (১২) ও নাতি সুজনকে (১০) নিয়ে বসবাস করেন তিনি । বৃদ্ধা খুদেজার উপার্জনে চলে চারজনের সংসার। প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় করেন তিনি।

খুদেজা বেগম বলেন, 'আমার চার ছেলে, কোনো মেয়ে নেই। এক ছেলে দেশের বাড়িতে থাকেন। বাকি দুই ছেলে এই জেলায় বদলি-কামলা দেয়। তারা আমার খোঁজখবর রাখে না। পৃথক সংসার তাদের । স্বামীর প্যারালাইসিস। আমার সাথে থাকা নাতি-নাতনির মা ৫/৬ বছর আগে আমার ছেলেকে রেখে চলে যায়। পরে ছেলেটাও নিখোঁজ হয় । তারা এখন আমার সঙ্গেই থাকে । ওদের মুখে দুই বেলা খাবার দেব নাকি শীতের পোশাক দেব।'

খুদেজার মতো বৃদ্ধ আলী হোসেন (৬৫) একটি খড়ের ঘরে বসবাস করেন। কিন্তু রাতে ঘরের ভেতর চারপাশ দিয়ে বাতাস ঢোকে। শীতে তিনি খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।

বৃদ্ধ আলী হোসেন বলেন, 'বুড়া মানুষের শীত বেশি। রাতে শীতে ঘুমাবার পাই না। খ্যাতা (কাঁথা) দিয়া উম হয় না। খ্যাতাও ছেঁড়া। কত কষ্ট কইরা শীতে থাকি। কয়েকজন কম্বল দিয়া গেছে। এতো হাতল (পাতলা), যা দিয়া ঠান্ডা কমে না।'

jagonews24

কুড়িগ্রাম থেকে মুন্সিগঞ্জে চুক্তিতে আলু রোপণ করতে এসেছেন দিদার মিয়া (৪৫)। তিন মেয়ে, দুই ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে ৭ সদস্যের অভাবের সংসার তার। কোনোমতে খড়কুটো দিয়ে একটি ঘর নির্মাণ করেছেন তিনি।

দিদার মিয়া বলেন, 'ঠান্ডার কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছি না। জমিতে গিয়ে কাজ করাটা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। কনকনে ঠান্ডার সঙ্গে নদী এলাকায় বাতাস বইছে। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র না থাকায় আমাদেরকে নিদারুণ কষ্টে শীত নিবারণ করতে হচ্ছে।'

সরকারি ও বেসরকারিভাবে চরাঞ্চলের শীতার্ত ভাসমান এসব মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। টঙ্গীবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা পারভীন বলেন, এ বছর সরকারিভাবে উপজেলার অসহায় শীতার্তদের মাঝে ইতোমধ্যে ৬ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি ভাসমান অস্থায়ী শীতার্তদের মধ্যেও কম্বল বিতরণ করা হয়।'

এএএইচ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]