ছোট উদ্যোক্তাদের চোখে বড় স্বপ্ন
মাত্র ৬ বছর আগের কথা। তখনও বগুড়ার আদমদীঘির শাওইল এলাকার তাঁতী সম্প্রদায়ের লোকেরা খটখটি বা গর্ত তাঁতে মশারি ও গামছা তৈরি করতেন। সেই মশারি ও গামছাগুলো শাওইল ও সান্তাহার হাটে প্রতি সপ্তাহে পাইকারি বিক্রি হত। রাতদিন করে পরিশ্রম করার পরও নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে হতো তাদের পণ্য।
তবে এখন পরিবর্তন ঘটেছে এই অঞ্চলের হাজার হাজার তাঁতিদের। দরিদ্র তাঁতিদের ভাগ্যোন্নয়নে এগিয়ে এসেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। এখন দিনবদলের পালায় হস্তচালিত খটখটি বা গর্ত তাঁতের পরিবর্তে ব্যবহার হচ্ছে বিদ্যুত চালিত তাঁত। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে তাদের উৎপাদিত পণ্যেও।
এখন শাওইল হাটে গামছা বা মশারি পাইকারি বিক্রি হয় না। সেখানে গামছা-মশারির পরিবর্তে স্থান করে নিয়েছে শাল-চাদর, কম্বল ও সুতারদড়ি। এ হাট প্রতি সপ্তাহে দু’বার বসে। রোববার ও বুধবার। সকাল নয়টা-দশটার মধ্যে শেষ হয়ে যায় হাটের কার্যক্রম।

এ অঞ্চলে শাল চাদরের প্রচলন হয়েছে নব্বই দশকের শেষ দিকে। বাংলাদেশে গামেন্ট্স ও সোয়েটার ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ শাল চাদরের আবির্ভাব ঘটে। আর আবির্ভাব ঘটার পেছনে কাজ করে সোয়েটার বা গামেন্ট্স ফ্যাক্টরির পরিত্যাক্ত সূতা। এ শাল চাদর তৈরির প্রধান উপাদান বা কাঁচামাল হলো সোয়েটার ফ্যাক্টরির পরিত্যাক্ত উলের সূতা।
যে সূতাগুলো সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে ব্যবহারের অনুপযোগী বলে বিবেচিত হয় সেগুলো ঝুট হিসেবে বিক্রি হয় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের সোয়েটার তৈরি হয় এমন এলাকায়।
শাওইল হাটে গড়ে উঠেছে এ রকম ঝুট থেকে বাছাইকৃত উলের সূতার একমাত্র বাজার। বাংলাদেশের যে যে অঞ্চলে উলের শাল চাদর, মাফলার, কম্বল, সুতারদড়ি তৈরি হয় সেখানকার তাঁতিরা এ শাওইল হাট থেকে উলের সূতা কিনে নিয়ে যান। আর এ ঝুট থেকে বাছাইকৃত উলের সূতা দিয়ে আগে তাঁতিরা খটখটি/গর্ত তাঁত ও চিত্তরঞ্জণ তাঁতে দু’হাত দু’পার সাহায্যে সারাদিনে ৫/৭টি প্লেন শাল চাদর, আর কেউ কেউ ডগির সাহায্যে হালকা নকশা শাল চাদর তৈরি করতেন। এতে করে তাদের সংসারে অভাব লেগেই থাকতো।

সেখানে ইভিং পদ্ধতিতে শাড়ি, লুঙ্গী, গামছা, মশারি, থ্রিপিছ, শাল চাদর ইত্যাদি বস্ত্র তৈরি করতে পুরনো আমলের তাঁত ব্যবহৃত হত। বর্তমানে পাওয়ারলুমের যন্ত্রাংশ স্থাপন করে তৈরি করা হয়েছে বিদ্যুৎচালিত তাঁত বা সেমি পাওয়ারলুম।
স্থানীয় একজন তাঁতি জানান, একটি শাল তৈরির বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। এরমধ্যে ঝুট থেকে সূতা তৈরি, সূতা ডাইং করা, চরকার সাহায্যে নলি-ববিন ভরা, ড্রামে তেনা জড়ানো, সানা-বও প্রক্রিয়া এবং নকশা তৈরির জ্যাকেট। শাল চাদর বা শাড়িতে নকশা তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জ্যাকেট ব্যবহার করা হয়।
তাঁতিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কেউ কেউ উলের শাল চাদর, কেউ গামছা আবার কেউবা কম্বল তৈরি করতেন। আর এসব তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আদমদীঘি উপজেলার নসরৎপুর ইউনিয়নের শাঁওইল বাজারে পাওয়া যেত। কিন্তু তাঁতিদের পণ্য তৈরির প্রক্রিয়া ছিলো সনাতন পদ্ধতির। সেখানে ছিলনা আধুনিক পদ্ধতির কোনো বিদ্যুত চালিত তাঁত এবং প্রযুক্তির কোনো ছোঁয়া। তৈরিকৃত শাল চাদরের গুণগতমানও ভালো ছিল না। এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও তাঁতিদের মতে, এই খাতে ২০০ কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভারের মধ্যে সুতার মার্কেটই ১২০ কোটি টাকার এবং উষ্ণ পোশাকের মার্কেট ৮০ কোটি টাকার। তবে অনেক ব্যবসায়ী আবার দাবি করেন তাদের এই বাজারের বার্ষিক টার্নওভার ৩০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।
তবে দেশের উত্তরাঞ্চলে ডাইং মেশিন না থাকায় শাওইল বাজারে ব্যবহার করা সুতাগুলো রঙ করার জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী বা টাঙ্গাইলে পাঠাতে হয়। এতে এক কেজি সুতা রঙ করতে ৪০-৫৫ টাকার মতো ব্যয় করতে হয়।
তাঁতি সমবায় সমিতির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেনের মতে, মহাসড়ক থেকে তাদের হাটে পৌঁছানোর জন্য ৪ কিলোমিটার রাস্তা সরু এবং ভাঙা। মালামাল আনা নেয়ার কাজে ব্যবহৃত ট্রাকগুলো যাতায়াত করতে পারে না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া প্রয়োজন।

৬ বছর আগে এসএমই ফাউন্ডেশন এই অঞ্চলটিকে একটি সম্ভাব্য শিল্প গ্রুপ হিসেবে বেছে নেয়। ২০১৪ সালে এখানকার তাঁতিদের তারা দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদান করে। একইসাথে শাওইল বাজারের ১০৭ ব্যবসায়ীদের অ্যাকাউন্টিং, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, ডিজাইন, ডাইং, রফতানি-আমদানি নীতি, বিপণন ও নেতৃত্বের বিষয়ে ১৩টি প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, আমাদের নিজস্ব তহবিল থেকে এখানকার তাঁতিদের প্রায় ৬ কোটি কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি। এ বছর সরকার এসএমই ফাউন্ডেশনকে সারা দেশে তার ১৭৭টি নির্বাচিত ক্লাস্টারের মধ্যে বিতরণের জন্য আরও ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। শাওইল বাজারের তাঁতিদের মাঝে এ ব্যাপারে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
তবে স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলেন, এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে প্রদান করা ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হলে তাদের পক্ষে এটি চালানো কষ্টদায়ক হবে। কারণ সুদের এই হার অন্যান্য ব্যাংকের সমান। তাই কিছুটা হলেও এই হার কমানো প্রয়োজন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আমিনুল হোসেন বলেন, তিনি শাওইল বাজারের ব্যাংক এশিয়া শাখার মাধ্যমে এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে ১৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এখন নতুন করে ব্যবসা প্রসারিত করতে হলে সংগঠনটিকে সহজ শর্তের পাশাপাশি সুদের হার ৪ থেকে ৫ শতাংশে নামানো প্রয়োজন।
সাধারণ তাঁতিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাস্তবায়িত বিদ্যুৎচালিত তাঁতে শাল (শীতবস্ত্র) তৈরির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আয় বৃদ্ধিকরণ শীর্ষক ভ্যালু চেইন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রদত্ত প্রশিক্ষণ, অব্যাহত পরামর্শ, নিয়মিত পরিদর্শন, ফলোআপ ও সার্বক্ষণিক মনিটরিং করার ফলে প্রকল্পের আওতাভুক্ত তাঁতিরা লাভজনকভাবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছেন।
তারা জানান, হস্তচালিত তাঁতে যেখানে দৈনিক ৭-৮ পিছ শাল চাদর তৈরি হত, বর্তমানে বিদ্যুৎচালিত তাঁতে তৈরি হচ্ছে ২০-২২টি শাল চাদর। বিদ্যুৎচালিত তাঁত একটি লাভজনক ব্যবসা। এতে হস্তচালিত তাঁতের তুলনায় কায়িক পরিশ্রম কম কিন্তু লাভের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি। বিদ্যুৎচালিত তাতে প্রতি পিছ শাল চাদরে গড়ে ৭০- ৭৫ টাকা খরচ করে ৩০-৪০ টাকা লাভ হয়।

তবে কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তাঁতিরা। বলেন, হস্তচালিত তাঁতের তুলনায় এটি ব্যয়সাপেক্ষ ও ঝুঁকির সম্ভাবনা রয়েছে। বৈদ্যুতিক শর্ট-শার্কিটের কারণে পাওয়ারলুম পরিচালনাকারীর যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে। একটানা কয়েকদিন বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ থাকতে পারে।
এছাড়া সমস্যার মধ্যে আরও রয়েছে নতুন পাওয়ারলুম ও জ্যাকেট ক্রয় করতে টাঙ্গাইল বা সিরাজগঞ্জ যেতে হয়। পাওয়ারলুমের আনুষাঙ্গিক উপকরণ তৈরির কোনো কারখানা শাওইলে নেই।

শাল চাদর শীতকালীন পোশাক হওয়ায় সারা বছর বিক্রি করা যায় না। গরমের সময় বাইরের কোনো পাইকারি ক্রেতা না আসার কারণে স্থানীয় মধ্যস্বত্তভোগী মহাজনরা তাঁতিদের অভাবের সুযোগ নিয়ে কম দামে শাল চাদর কিনে স্টক করেন।
কাঁচামালের দাম দিনদিন বৃদ্ধি পেলেও সে তুলনায় শাল চাদরের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে না বলেও জানান তাঁতিরা।

মাঠ পর্যায়ের একাধিক তাঁতির সাথে কথা বলে কিছু সুপারিশও মিলেছে। তাদের মতে প্রকল্প এলাকায় আরও ডিজাইনার ও মেকানিক তৈরি করা প্রয়োজন। ভালোমানের সূতা ব্যবহার করে উন্নত ডিজাইনের শাল তৈরি করা দরকার। একই ব্যক্তিকে ৪/৫টি পাওয়ারলুম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আলাদা ফ্যাক্টরি ঘর তৈরিতে উৎসাহিত করা যায়। সারা বছর যাতে শাল-চাদর বিক্রি হয় সেজন্য দেশে-বিদেশে বাজার সংযোগের ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানানো হয়। এছাড়া এককালীন পরিশোধে বছরব্যাপী ঋণের ব্যবস্থা করা। কাঁচামালের সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
বর্তমানে তাঁত পেশায় তার সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। বাড়িতে যেখানে থাকার মতো ঘর ছিল না সেখানে চার রুম বিশিষ্ট একটি আধা-পাকা ঘর করেছেন তিনি।
জেডএইচ/এমআরআর/এফএ/জেআইএম