খাঁ খাঁ করছে তিস্তা ব্যারাজ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লালমনিরহাট
প্রকাশিত: ০৬:৪৭ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি পরিণত হয়েছে ধু-ধু বালুচরে। বালুর স্তূপে গতিপথ হারিয়েছে মূল নদী। পানি না থাকায় নদীর প্রায় ১৩০ কিলোমিটারজুড়ে খাঁ-খাঁ করছে। নদীতে কোনো স্রোত নেই, নেই নৌকা চলাচলও।

বর্ষা মৌসুমে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারাজ’ রক্ষায় খুলে দেয়া হয় ৫২ গেট। এতে শুধু ব্যারাজের আশপাশের বাসিন্দারাই নন, ভাটিতে থাকা লাখ লাখ মানুষও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নদীভাঙনে বসতভিটাসহ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ পরিবার। তাদের কেউ বাঁধের রাস্তায় কেউ বা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। অথচ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সেই তিস্তা নদী এখন ধু-ধু বালুচর।

Lalmonirhat-Tista

ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর নীলফামারীর কালীগঞ্জ উপজেলার ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে। ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর বাংলাদেশ অংশে রয়েছে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ভারত সরকার একতরফা তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রণ করায় প্রতি বছর বর্ষা শেষ হতে না হতেই বাংলাদেশ অংশে মরা খালে পরিণত হয়।

Lalmonirhat-Tista

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় একদিকে যেমন বর্ষা মৌসুমে ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে, তেমনি শুষ্ক মৌসুমেও তিস্তা ব্যারাজ সংলগ্ন স্থানে ভারত তাদের গোজলডোবায় বাঁধের সাহায্যে একতরফাভাবে পানি আটকে দিচ্ছে। যাতে বাংলাদেশের উত্তর জনপদের লাখ লাখ কৃষকের বোরা চাষাবাদ ব্যাহত হয়। ফলে দিন দিন প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি।

সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে যে হারে পানিপ্রবাহ কমে আসছে তাতে শিগগিরই কাঙ্ক্ষিত পানিচুক্তি সম্পন্ন না হলে মরা খালে পরিণত হতে পারে বহুল আলোচিত তিস্তা নদী। এতে করে নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা উত্তর জনপদের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

Lalmonirhat-Tista

আগামী ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরের সূচি চূড়ান্ত হওয়ায় খুশি তিস্তাপারের কোটি মানুষ। পানিচুক্তি নিয়ে আশার আলো দেখছেন তিস্তা পাড়ের মানুষ।

সরেজমিন দেখা গেছে, তিস্তার মূল নদীতে বড় বড় বালুর স্তুপ। নদীতে পানি নেই। চোখ জুড়ে শুধুই বালুচর। ব্যারাজের মোট ৫২ গেটের মধ্যে ৪৫টি বন্ধ করে উজানে পানি আটকানোর চেষ্টা করছে ভারত। এতে করে যেটুকু পানি উজানে জমছে তাতেই ব্যারাজটির বাকি ৭ গেটের মাধ্যমে ইরি ধানের জন্য সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

Lalmonirhat-Tista

তিস্তা পাড়ের দোয়ানী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, ‘এই তিস্তা নদী আমাদের কোনো উপকারে আসে না। শুধু প্রতিবছর ভাঙনে আর পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হই।’

তিস্তা পাড়ের জেলে হযরত আলী (৪৫) বলেন, ‘তিস্তায় পানি নেই। একেবারেই শুকনো নদী। জোয়ারে যে পানি আসে সে পানি দিয়ে ইরি ধান চাষ হয়। দুই দেশের সরকার যদি যোগাযোগ করে তিস্তায় পানি দেয় তাহলে হাজার হাজার জেলে বাঁচবে।’

Lalmonirhat-Tista

কালীগঞ্জ উপজেলার চর বৈরাতী গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন (৫০)। তিস্তায় পানি না থাকায় ভুট্টা ও কুমড়া ক্ষেতে সেচ দিতে পারছেন না। শ্যালোমেশিন বসিয়ে ক্ষেতে সেচ দিতে হচ্ছে। এভাবে সেচ দিতে তার অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। তিনি বললেন, নদীতে পানি থাকলে এতো খরচ হতো না।

এ বিষয়ে তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তা নদীর উজানে বর্তমানে দুই হাজার ৫০০ কিউসেক পানি আছে। তা দিয়ে সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকবে।’

Lalmonirhat-Tista

তিনি আরও বলেন, ‘তিস্তা নদীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে চার হাজার কিউসেক পানি। কিন্তু ডিসেম্বর মাসের পর থেকে তিস্তায় পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়।’

রবিউল হাসান/আরএইচ/এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]