কমেছে লেইস-ফিতার ফেরিওয়ালা, ঝুঁকছেন ভিন্ন পেশায়

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঠাকুরগাঁও
প্রকাশিত: ০৮:২৪ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা মকবুল হোসেন। ২০ বছর ধরে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন কানের দুল, নাকের ফুল, টিপের পাতাসহ বিভিন্ন জিনিস। এর আয় দিয়েই মেয়েকে দিয়েছেন বিয়ে। এখন ছেলেও কাজ করছেন। তবে জীবনের শেষ পর্যন্ত এ পেশায় থাকতে চান তিনি।

মকবুল বলেন, আগের মতো ব্যবসা হয় না। কমে গেছে আয়। বয়স্কভাতার জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু টাকা দিতে না পারায় বয়স্কভাতার কার্ড হয়নি।

jagonews24

ঠাকুরগাঁওয়ের আরেক ফেরিওয়ালা নিজাম বলেন, ‘আমি প্রায় ২২ বছর ধরে এই ফেরিওয়ালার ব্যবসা করে আসছি। এই ব্যবসা করতে ভালো লাগে। যখন আমি গ্রামে যাই, তখন বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ আশপাশে ভিড় করেন। বেছে বেছে তাদের পছন্দের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনেন। কারণ, গ্রামের অনেক নারী ইচ্ছে থাকলেও বাজারে গিয়ে তাদের নিজের পছন্দমতো জিনিস কিনতে পারেন না।’

তিনি আরও বলেন, প্রতিদিনই আমার নতুন নতুন গ্রাম বেড়ানো হয়। অনেক রকমের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কিন্তু এই ব্যবসা সারা বছর একইভাবে হয় না। বর্ষা মৌসুমে সব সময় গ্রামে যাওয়া হয় না। অসুস্থ হলে বের হওয়া যায় না। তবুও মানুষের কাছে হাত পেতে খেতে হচ্ছে না। মন্দ কোনো কাজ করতে হচ্ছে না। যতদিন বেঁচে আছি ও সুস্থ আছি ততদিন আমি এই ব্যবসাকে ধরে রাখার চেষ্টা করব।

jagonews24

শুধু মকবুল আর নিজামই নন, তাদের মতো অসংখ্য ফেরিওয়ালা রয়েছেন এই জেলায়। সারাদিন বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে তারা ফেরি করে বেড়ান পরিবারের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেয়ার স্বপ্ন। কেউ চুড়ি, লেজ ফিতা, কানের দুল, নাকের ফুল, প্লাস্টিকের জিনিস, কেউ বা চানাচুর, বাদাম বিক্রি করেন। তবে কালক্রমে কমে আসছে ফেরিওয়ালাদের সংখ্যা। যান্ত্রিকতার জীবনে অনেকে এই পেশা বদল করে ঝুঁকছেন ভিন্ন পেশায়। কেউ রিকশা চালান আবার কেউ দিন মজুরি করছেন।

ঠাকুরগাঁও জেলা পরিসংখ্যান অফিসে ফেরিওয়ালাদের সঠিক কোনো ডাটা নেই। তবে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, দুই দশক আগে জেলায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ এই পেশায় যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে ২ থেকে ৩ হাজারে নেমে এসছে এই সংখ্যা।

jagonews24

হাসিনুর রহমান নামে এক হোটেল শ্রমিক জানান, আমি এক সময় গ্রামগঞ্জে ফেরি করে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র বিক্রি করতাম। ওই পেশায় বেচা-কেনা কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিয়েছি। এখন হোটেলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছি।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নারগুন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পয়গাম আলী বলেন, আমার ইউনিয়নে প্রায় শতাধিক মানুষ ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আগে ফেরিওলাদের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধির কারণে অনেকে বাধ্য হচ্ছে এই পেশা ছাড়ার।

jagonews24

ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের সাবেক বাংলা বিভাগের প্রধান এবং লেখক ও গবেষক প্রফেসর মনতোষ কুমার দে বলেন, আগেকার দিনে গ্রামের যেখানে সেখানে হামেশা দেখা যেত ফেরিওয়ালাদের। কালের বিবর্তনে ও আকাশপথ খোলা থাকার কারণে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে এই পেশা। সরকারি প্রণোদনা পেলে আগের পেশায় ফিরতে পারত অনেকে।

jagonews24

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ড. কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, ফেরি করে জিনিসপত্র বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা এই পেশার সঙ্গে গ্রাম বাংলার অনেক মানুষ জড়িত ছিল। কালের বিবর্তনে এই পেশার মানুষগুলো ভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। তাদের তথ্য ও তালিকা করে সরকারি সহায়তা ও ক্ষুদ্র ঋণ দানের ব্যবস্থা করা হবে। তাহলে হয়তো অনেকেই ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ ও ঐতিহ্যবাহী পেশা রক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করবে।

তানভীর হাসান তানু/এসজে/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]