দমে না যাওয়া বীণা চাকমার গল্প

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাঙামাটি
প্রকাশিত: ০৬:৪২ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২১

বীণা প্রভা চাকমা। জন্ম তার রাঙামাটি সদরের অদূরে বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ের এক গ্রামে। বাবা রতি রঞ্জন চাকমা ও মা গুড়ি চাকমার আট কন্যা ও এক ছেলের মধ্যে তিনি তৃতীয়। গ্রামে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা শেষে বড় বোনের হাত ধরে চলে আসেন শহরের মাঝের বস্তি এলাকায়। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপরই বীণা চাকমার জীবনে পরিবর্তন আসে।

গ্রামের দুরন্ত কিশোরী শহরে এসে খেলাধুলা জগত থেকেই যেন বের হয়ে যেতে হল। কিন্তু তখনই তার সামনে ছায়া হয়ে আসেন বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষিকা নিরূপা দেওয়ান। তার হাত ধরেই স্কুলে আবারও শুরু হল খেলাধুলার পাঠ। প্রতিদিন ক্লাস শেষে এক ঘণ্টা করে হ্যান্ডবলের প্রশিক্ষণ দেয়া হত। যার পুরোটাই নেতৃত্ব দিত নিরূপা দেওয়ান। আশির দশকে দেশে নারী হ্যান্ডবলে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন শুরু হলে সেই পরিবর্তনের ধারায় নিজেদের মানিয়ে নেন বীণা প্রভা চাকমারা।

পুরুষের পাশাপাশি হ্যান্ডবলে অংশ নিয়ে রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় টানা তিনবার জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। হ্যান্ডবলে মাঠে নেতৃত্ব দেয়া বীণা প্রভা চাকমা অ্যাথলেটেও সমান পারদর্শী ছিলেন। জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে বেশ কয়েকবার পুরস্কারও জিতেছেন এই ক্রীড়াবিদ। জিতেছেন অজস্র পুরস্কার, অর্জন করেছেন নানা সম্মাননাও।

jagonews24

কৃতী এই খেলোয়াড়কে ২০১৩ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা পুরস্কার, ২০১৮ সালে জাতীয় পর্যায়ে সেরা গার্ল গাইড শিক্ষিকা নির্বাচিত করা হয়। বিভিন্ন সময়ে জেলার হয়ে নারী দলের সঙ্গে কোচ কিংবা ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

খেলাধুলার পাঠ চুকিয়ে বীণা চাকমা শারীরিক শিক্ষায় রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন গত ২২ বছর ধরে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদিকা হিসেবে।

খেলাধুলায় বিষয়ে জানতে চাইলে বীণা প্রভা চাকমা বলেন, ‘আশির দশকে যখন আমাদের পথচলা শুরু, তখন এখানকার মতো এত ভালো অবস্থা ছিল। সবদিক দিয়ে বাধা। ঘরে বাধা, সমাজে বাধা, যেখানেই যেতাম মেয়ে হিসেবে শুধুই বাধার মুখে পড়তাম। তারপরও নিরূপা ম্যাডামের সাহসিকতায় তার চলা পথ ধরে এগিয়ে গেছি আমরা। দেশে ৮০ সাল থেকে মেয়েদের হ্যান্ডবল চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হয়। আর আমরা ৮৩ থেকেই বিদ্যালয়ে হ্যান্ডবল শুরু করি। শুরুর বছরেই আমরা পুরো দেশ মাতিয়ে দিলাম। ময়মনসিংহে গিয়ে খেলে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই।’

তিনি আরও বলেন, ‘৮৫’তে ঢাকায় এবং ৮৭’তে খুলনায় চ্যাম্পিয়ন হই। পাশাপাশি আমরা আন্তঃজেলা টুর্নামেন্ট, বিভাগীয় টুর্নামেন্টেও অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করি। অ্যাথলেট ও ভলিবলে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে বেশ কয়েকবার পুরস্কার অর্জন করি। বলতে গেলে স্কুল পর্যায়ে থাকাকালে আমরা হ্যান্ডবল, অ্যাথলেট ও ভলিবলে সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছিলাম। আমাদের টিমটা সেসময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে সেরা ছিল। তবে ৮৯ সালে এসএসসি দেয়ার পর পরবর্তী সময়ে একটি প্রাইভেট চাকরিতে প্রবেশের পর খেলাধুলায় কিছুটা ভাটা পড়ে। কিন্তু তার মধ্যেও আমি বিপিএড কোর্স পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অর্জন করি। বিপিএড কোর্সটি করতে গিয়ে পরিবারের বাধার মুখে পড়লেও পরবর্তীতে তারা বুঝতে পেরে আমাকে আর নিষেধ করেনি।’

jagonews24

এই সফল নারী বলেন, ‘পরিবারের ভাষ্য ছিল, কোর্সটি পুরুষদের জন্য নারীদের জন্য নয়। আমি তাদেরকে সব বুঝিয়ে বলার পর এবং বিষয়টি নিয়ে আমার একাগ্রতা দেখে পরিবার থেকে আমাকে সম্মতি দেয়। এরপর ১৯৯৯ সালে সরকারি চাকরি নিয়ে আমি রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করি। নিজে যে বিষয়ে একেবারে শৈশব থেকে কাজ করছিলাম, যে বিষয়টি করে আমি সবসময় আনন্দ পেতাম, বড় হয়ে চাকরি সূত্রে সেই একই বিষয়ে শিক্ষকতা করতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।’

খেলাধুলাকেই জীবনসঙ্গী করে নেয়া এই নারী বলেন, ‘আমাদের আট বোনের মধ্যে তিন বোনই ক্রীড়াক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে। যার স্বীকৃতিস্বরূপ আমার মাকে রত্নগর্ভা পুরস্কারও দেয়া হয়েছে। বর্তমান প্রজন্ম খেলাধুলা থেকে অনেক দূরে। অভিভাবকদের অতিমাত্রায় সন্তানদের পড়ালেখার প্রতি ঝোঁক এবং শিক্ষার্থীদের মোবাইলের প্রতি আসক্তির কারণে খেলাধুলায় পাহাড়ের অতীতের সেই স্বর্ণালী যুগ এখন আর নেই।

একদিন আবারও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে পাহাড়ের নারীরা আবারও নেতৃত্ব দেবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদিকা ও বীণা চাকমার শিক্ষা এবং খেলোয়াড় জীবনের গুরু নিরূপা দেওয়ান বীণা প্রভাকে আশির দশকে পাহাড়ের একজন উদীয়মান তারকা হিসেবে মন্তব্য করে বলেন, তার সময়জ্ঞান ও খেলার প্রতি আন্তরিকতা ছিল অনেক বেশি। সবসময় খেলা নিয়ে সিরিয়াস থাকতো। যার ফলে আমরা বেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তাকে যেখানেই দায়িত্ব দেয়া হতনা কেন, সবসময় সফলতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করতো। মহিলা ক্রীড়া সংস্থায়ও তার সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রেখেছে।’

jagonews24

রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মৃদুল কান্তি তালুকদার বলেন, ‘খেলাধুলায় বীণা প্রভা চাকমা এই অঞ্চলের মেয়েদের জন্য আইডল। আমার বিদ্যালয়ের মেয়েদের খেলাধুলা প্রতি ঝোঁক বাড়াতে তার আন্তরিকতার কমতি নেই। তিনি সবসময় তার কাজে আন্তরিক।’

জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি বরুণ দেওয়ান বলেন, ‘সেই ছোট থেকেই খেলাধুলার প্রতি ঝোঁক ছিল বীণার। হ্যান্ডবল, অ্যাথলেট ও ভলিবল নিয়ে মাঠে পড়ে থাকতো। তাকে দেখে এখন অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে খেলোয়াড় জীবন গড়ার চেষ্টা করছে।’

শংকর হোড়/এসজে/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]