লকডাউনে ঝালকাঠির কর্মহীন মানুষের পাশে কেউ নেই

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ০৮:৪৬ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০২১

প্রতিদিন সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পৌরসভা ও সদর উপজেলা পরিষদের সামনে জমছে অভাবী মানুষের ভিড়। ত্রাণের আশায় সরকারি এক অফিস থেকে ছুটছেন অন্য অফিসে। কখনো যাচ্ছেন বিত্তশালীদের বাড়ির সামনে।

ঝালকাঠিতে কঠোর লকডাউনের মধ্যে আয় হারিয়ে দুর্বিষহ অবস্থায় থাকা এসব মানুষের খবর রাখছেন না কেউ। গতবছর এই সময়ে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম থাকলেও এ বছর লকডাউনের মধ্যে অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি কোনো বিত্তবান মানুষ।

পৌরসভার পশ্চিম ঝালকাঠি এলাকার নুর জাহান বেগম (৬০) লকডাউনের আগে বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে সংসার চালাতেন। কাজ না থাকায় এখন তার পরিবার না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। গত দুইদিন ধরে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে বসে ত্রাণের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।

নুরজাহান বেগম আক্ষেপ করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘অন্যের বাসায় কাম করতে গেলে বাড়ির মালিক কয় করোনা-লকডাউন, এহন কামে আওয়া লাগবে না। এদিকে ঘরে চাউল নাই, বাড়িওয়ালা ঘরভাড়া চায়। কোথায় যামু? সমিতির লোকজন কিস্তি চায়। ঘরের পাঁচজন সদস্য তিনদিন ধইরা না খাইয়া থাহার মতো অবস্থা। এজন্য আমি ডিসি স্যারের দ্বারে ত্রাণের লইগ্যা আইছি।’

jagonews24

শুধু নুরজাহান বেগমই নয়; জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে হাসি বেগম (৪৫), প্রতিবন্ধী আবদুল আজিজ (৬৪), মায়া বেগমসহ (৭৩) শতাধিক খেটে খাওয়া অভাবী মানুষ ভিড় করেছেন একটু ত্রাণের আশায়। তাদের বেশিরভাগই চল্লিশোর্ধ নারী ও স্বামী পরিত্যক্তা বা বিধবা। তাদের সবার চোখেই ক্ষুধা আর পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অজানা আতঙ্ক কাজ করছে। তবে জেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, এবার সরকারিভাবে কোনো ত্রাণ আসেনি।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহ এবং পরে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১৪ দিন কঠোর লকডাউনের ঘোষণায় ঝালকাঠির খেটে খাওয়া অভাবী মানুষেরা বিপাকে পড়েছেন। প্রথম দিকে অনেকে পুঁজি ভেঙে খেলেও লকডাউনের নবম দিনে এসে মানুষ অভাব টের পাচ্ছেন।

শহরের চাঁদকাঠি এলাকার মনির হোসেন (৪৫) বলেন, ‘আমি গণপরিবহনে চাকরি করতাম। লকডাউনের মধ্যে আমাদের গাড়ি বন্ধ রয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে আছি। কেউ ত্রাণও দিচ্ছেন না। টিসিবির পণ্য কেনার সামর্থ্যও নেই। আর কিছুদিন গেলে না খেয়ে থাকতে হবে।’

শহরের কলাবাগান এলাকার হাসি বেগম বলেন, ‘ঘরে উপার্জনক্ষম আমি একাই। মানুষের বাসা-বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাই। এখন মালিকের অবস্থায়ই খারাপ, আমাদের কাজে রাখতে পারছেন না। অন্যের সাহায্য ছাড়া চলার উপায় নেই।’

jagonews24

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গতবছর ঠিক এই সময়ের লকডাউনে সরকারি অনুদান হিসেবে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিত্তশালীদের মাধ্যমে জেলার ৫০ হাজার মানুষ ত্রাণ সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু এ বছর সরকারিভাবে কোনো ত্রাণ সহায়তা আসেনি। ব্যক্তি পর্যায়ে তেমন কোনো ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগও নেই।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি পৌরসভার মেয়র লিয়াকত আলী তালুকদার বলেন, ‘লকডাউনে প্রতিদিনই পৌরসভার সামনে মানুষ ত্রাণের আশায় ভিড় করছেন। এ বছর সরকারিভাবে কোনো সহায়তা আসেনি। মানুষের জন্য কিছু করা যায় কি-না সে বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে আমরা পৌর পরিষদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি ও আমার পরিবার যেভাবে পারছি মানুষকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।’

জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সহায়তা পাওয়া যায়নি। প্রতিদিনই আমার কার্যালয়ের সামনে অভাবী মানুষেরা ভিড় করছেন। তবে শিগগিরই মানুষের হাতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের দুই হাজার ৫০০ টাকা মোবাইলে চলে যাবে বলে আশা করি।’

আতিক/এসআর/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]