১৭ বছর পর বাবা-মাকে ফিরে পাওয়া সবুজ সমালোচনার জবাবে যা বললেন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি চাঁদপুর
প্রকাশিত: ০৩:০৪ পিএম, ২৫ এপ্রিল ২০২১

‘আমার বাবা-মা মন্ত্রী-মিনিস্টার না হওয়ায় আমি খুশি হইনি বলে যারা আর জে কিবরিয়া ভাইয়ের প্রকাশিত ভিডিওতে মন্তব্য করছেন তারা মনে হয় আর জে কিবরিয়া ভাইয়ের প্রথম ভিডিওটি দেখেননি। আমি সেখানেই বলেছিলাম, আমার বাবা একজন কৃষক। তাই আমার বাবা মন্ত্রী বা এমপি হবে তা আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। আর আমার মধ্যে যদি এমন কোনো বিষয় থাকত তাহলে আমি আমার ফ্যামিলিকে খুঁজে বের করতাম না। আর বের করলেও তাদের সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত চলে আসতাম না।’

কথাগুলো বলছিলেন ১৭ বছর আগে ঢাকায় হারিয়ে গিয়ে অবশেষে বাবা-মায়ের কোলে ফিরে আসা সবুজ।

jagonews24

শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) রাতেই বাবা-মার সন্ধান পেয়ে তাদের সাথে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন সবুজ। তিনি ফিরে আসায় এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তাকে একনজর দেখার জন্য আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই ছুটে আসছেন বাড়িতে। বাড়িতে আসার পর ন্যূনতম বিশ্রামটুকু নেয়ার সুযোগ পাননি সবুজ।

সবুজ আরও বলেন, ‘আর জে কিবরিয়া ভাইয়ের প্রকাশিত ভিডিওতে আমি যখন আমার বাবা-মায়ের দেখা পাই. তখন আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ি এবং বেশ কান্নাকাটি করি। আমি এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম যে ভিডিওর শেষে আমার কথা বলার মতো ভাষা ছিল না। পরে ওই ভিডিওটির কমেন্টে দেখলাম অনেকে বলছেন, ভিডিওর শেষে কেন বললাম না আমি অনেক খুশি। আর তাতেই অনেকে এমন কমেন্ট করেছেন। কিন্তু মূলত আমি এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম যে আমি সেসময় কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সবাইকে আমার পরিস্থিতি বোঝার অনুরোধ করছি। মূলত যে যখন যে পরিস্থিতিতে থাকে সেই তখন বোঝে তার অবস্থা।’

jagonews24

‘দীর্ঘ এতবছর পর আমি আমার পরিবারের সন্ধান পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত। যা আমি মুখের ভাষায় বলে বোঝাতে পারব না। বাড়িতে ছোটবেলায় যা দেখেছি তার সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি হারিয়ে যাওয়ার পরেও আমার আরও একটি ভাই ও একটি বোন হয়েছে। তারা তো কখনোই আমাকে দেখেনি। তাদের সঙ্গে দেখা করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত অনুভব করছি।’

সবুজের হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দাদা লাল মিয়া বলেন, ২০০৪ সালে সবুজকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম শেওড়াপাড়া তার খালার বাসায়। সে সময় এক শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে খাওয়া-দাওয়া করে সবুজকে নিয়ে আমি সেখান থেকে বের হয়ে রসুলপুর আসি। সে সময় সেখানে একটি মেলা চলছিল। সেখানে ওয়াসা ভবনের পাশে একটি দীঘি ও তার পাশের একটি দোকানে দাঁড়িয়ে তাকে আমি জলদি বাড়ি ফেরার কথা বলি কিন্তু সে রাজি হয়নি। এসময় আবহাওয়ার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। মনে হচ্ছিল খুব দ্রুতই বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেখান থেকেই সে হঠাৎ হারিয়ে যায়।’

‘হারিয়ে যাওয়ার পর চারদিন ধরে তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে বেবিট্যাক্সি দিয়ে মাইকিং করি। আমি একমাসের ওপর ঢাকার বিভিন্ন রাস্তাঘাট-অলিগলি তন্নতন্ন করে তাকে খুঁজি কিন্তু কোথাও তার দেখা পাইনি। দীর্ঘদিন তাকে খুঁজে না পেয়ে একসময় আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ি। যে কারণে আমাকে একে একে তিনটি অপারেশন করতে হয়েছে।’

এসময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সবুজ ওইসময় আমাকে ছাড়া আর কিছুই বুঝতো না। তার জন্য আমি ঠিকমতো প্রস্রাব-পায়খানা করতেও যেতে পারতাম না। এতটাই পাগল ছিল সে আমার জন্য। আমার নাতি ফিরে আসায় আমি এতটাই আনন্দিত যে দীর্ঘদিন বিছানায় পড়ে থাকার পর নাতির খবর পেয়ে এখন আমি হাঁটতে পারছি।’

jagonews24

সবুজের মা খোদেজা বেগম বলেন, ‘সবুজকে হারানোর পর সবসময় আমি নামাজ পড়ে মোনাজাত করে আমার ছেলের জন্য দোয়া করতাম। নামাজ শেষে সবসময় দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতাম যাতে আল্লাহ আমার ছেলেকে আমার বুকে ফিরিয়ে দেয় এবং সব বাবা-মায়ের সন্তানকে যেন তার বাবা-মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়। আমার ছেলে আমার বুকে এসেছে। তাই এখন আমার কাছে খাবারের চাইতেও তাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দটা অনেক বেশি।’

এদিকে দীর্ঘদিন পর বাড়িতে ফিরে আসায় সবুজকে একনজর দেখার জন্য ভিড় জমাচ্ছেন স্থানীয় ও আশপাশের এলাকার মানুষ। কারণ সবাই জানতেন ১৭ বছর আগেই সবুজ হারিয়ে গিয়েছিলেন। তার ফিরে আসাটা এলাকাবাসীর কাছে অপ্রত্যাশিত।

সুচিপারা পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হুমায়ুন কবির জানান, সবুজে হারিয়ে যাওয়ার পর তার মা সবসময় কান্নাকাটি করতেন। শুধু আমি নই; আমাদের পুরো এলাকা তার শোকে মর্মাহত ছিল। মায়ের ছেলে মায়ের বুকে ফিরে এসেছে শুনে আমরা এলাকাবাসী খুবই আনন্দিত।

উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে ঢাকায় দাদার সঙ্গে খালার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে হারিয়ে যান সবুজ। অবশেষে জনপ্রিয় রেডিও উপস্থাপক আর জে কিবরিয়ার ‘আপন ঠিকানা’ অনুষ্ঠানে সবুজকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তার বাবা-মার সন্ধান পাওয়া যায়। সবশেষ গত শুক্রবার সবুজের বাবা-মা আপন ঠিকানার স্টুডিওতে গিয়ে সবুজকে বুকে জড়িয়ে নেন। এসময় আর জে কিবরিয়া ও সবুজকে দীর্ঘদিন লালন-পালন করা এনজিও প্রতিষ্ঠান ‘ফ্যামিলিজ ফর চিল্ড্রেন’-এর পরিচালক শিখা বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।

নজরুল ইসলাম আতিক/এসআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।