প্রতিবন্ধী মাসুদার নিজের কোনো ঘর নেই

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ১২:৩৩ পিএম, ০৫ মে ২০২১

‘ভাইবোন মিলা সংসারে মেলা মানুষ। বাপ সারা দিন খাইটা খাওন জোগাইতে পারত না আমগোর। দেশে অভাব আর অভাব। কোনো কাম নাই। বাপ-মায় অল্প বয়সে বিয়া দিছে এক আধপাগলার লগে। সারাটা জীবন স্বামী সন্তান নিয়ে কষ্টে কষ্টে গেল। কোনো দিন জীবনে সুখ পাই নাই। হুনছি, সরকার গরিব মানুষেরে থাকার জায়গা দেয়। আমার তো কোনো থাকার জায়গা নাই।’

কথাগুলো শরীয়তপুর পৌরসভার ৩নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম কোটাপাড়া গ্রামে বাড়ির শারীরিক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মাসুদা বেগমের (৪৪)।

স্বামী মো. জলিল ছৈয়াল (৫০), মেয়ে রিমা আক্তার (২৬), কুনসুমা আক্তার (২২), নাদিয়া নদী (১২) ও মাসুদ ছৈয়ালকে (১৯) নিয়ে তার সংসার। অতিকষ্টে বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিয়ের প্রথম তিন বছর শ্বশুর বাড়িতে থাকলেও ভাসুর জমি কেড়ে নিলে সাত বছর বাবার বাড়ির একটি ঘরে গাদাগাদি করে থাকতেন মাসুদা। তার ভাইয়েরা বিয়ে করলে ঘরে যায়গা সংকুলান হয় না। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়ির কাজ করার শর্তে একটি টং ঘরে স্থান হয় মাসুদার পরিবারের। সেখানে থাকেন ১২ বছর। বর্তমানে পশ্চিম কোটাপাড়ার বাবুল মুন্সীর একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকছেন তিনি। একমাত্র ছেলে মাসুদ ছৈয়াল একটি কোম্পানির ভ্যান চালক।

jagonews24

কথা হয় মাসুদা বেগমের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি জানান, ভিক্ষা করতে এসে তাকে পছন্দ করেন সদর উপজেলার ডোমসার ইউনিয়নের চর ডোমসারের খাদিজা বেগম (৭৫)। তার ছেলে জলিল ছৈয়ালের সঙ্গে মাসুদার বিয়েও হয়। তখন মাসুদার স্বামী ঢাকাতে ইটের ভাঁটায় কাজ করতেন। তার মেঝ ভাসুর হাবিব ছৈয়ালের ঢাকা জুরাইনে গ্রিলের দোকান রয়েছে। জলিল ছৈয়াল যখন গ্রামে আসতেন তখন তার ভাই হাবিবের দোকানে দেখা করে আসতেন। গরিব বলে আসার সমর হাবিব জলিলকে এক হাজার টাকা করে দিতেন। এভাবে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে জলিলের কাছ থেকে জোর করে বাবা-দাদার পাওয়া ২২ শতাংশ জমি লিখে নেন।

তিনি বলেন, আমি জন্ম থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাই আমার বাবা মাটিতে গর্ত করে আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। বাবার বাড়ি শরীয়তপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের স্বর্ণঘোষ গ্রামে। তখন আমার বিয়ের তিন মাস। আমি পান খাব বলে হাতে নেই। স্বামী পান খেতে দেবে না বলে কেঁড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। তখন স্বামীর কনুই লেগে আমার বাম চোখ নষ্ট হয়ে যায়। একদিন বড় মেয়ে রিমা তার স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করছিল। আমি ছাড়াতে গিয়ে মেয়ের জামাইর হাতের আঙুল লাগে আমার ডান চোখটা নষ্ট হয়ে যায়। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেনি।

jagonews24

মাসুদা বেগম বলেন, স্বামী বর্তমানে মাটির কাজ করেন। কাজের মজুরিও কম। করোনার কারণে কাজও নেই। নেই এক টুকরা জমি, নেই ঘর। তাই ভাড়া থাকি। ছেলে কাজ করে যা পায় তা দিয়ে ঘর ভাড়া দেই।

মাসুদা বেগমের ছোট মেয়ে নাদিয়া নদী বলে, আমার মা চোখে দেখেন না। আমি সব সময় মায়ের পাশে থেকে উনার সব কাজ করি। আমাদের ঘর-বাড়ি নাই।

মাসুদা বেগমের মা নুজাহান বেগম জাগোনিউজকে বলেন, ‘আমার এই মাইয়াডা অনেক গরিবের কাছে বিয়া দিছি। ওগো যাগা সম্পদ কিছু নাই। অনেকদিন আমার বাড়িতে রইছে। ওগো বাড়িঘর নাই। আমিও থাকি আমার বাপের বাড়ি পশ্চিম কোটাপাড়া। আগে সবাই একলগে থাকতাম। ছেলেরা বিয়া-সাধি করছে, এহন আর ঘরে যায়গা হয়না। মেয়েটা অনেক গরিব মানুষ ওর অনেক দুঃখ, কষ্ট। সরকার যদি একটা ঘর দিত। তাইলে ওগো মাথা গোজার ঠাই হতো।’

শরীয়তপুর পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট পারভেজ রহমান জন জাগোনিউজকে বলেন, ‘মাসুদা বেগমের সম্পর্কে জানলাম। তিনি একজন শারীরিক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, আর্থিকভাবেও দুর্বল। আমাদের পৌরসভা থেকে তাকে সহযোগিতার চেষ্টা করবো।’

মো. ছগির হোসেন/আরএইচ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]