দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন ঝালকাঠির প্রতিবন্ধীরা


প্রকাশিত: ১১:৪০ এএম, ০২ ডিসেম্বর ২০১৫

ঝালকাঠির রাজাপুরের বিষখালী নদীর ভাঙন কবলিত বড়ইয়া ইউনিয়নের প্রতিবন্ধীরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দীর্ঘদিন থেকে। ফলে তারা পরিবারের বোঝা হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

এদিকে, ব্যক্তি বা এনজিও এমনকি প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কেউ এগিয়ে আসেনি তাদের কাছে। বছরের পর বছর অনেকেই প্রতিবন্ধী ভাতা থেকেও বঞ্চিত হয়ে আসছেন। প্রতিবন্ধী পরিবারগুলো বিষখালী নদীর ভাঙনে ভিটেবাড়ি হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি।

এ ব্যাপারে পালট বড়ইয়া প্রতিবন্ধী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আলমগীর শরিফ বলেন, বড়ইয়া ইউনিয়নে প্রায় দেড় হাজার প্রতিবন্ধী আছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ বড়ইয়া, পালট ও বড়ইয়া গ্রামেই ৫ শতাধিক। এসব প্রতিবন্ধী পরিবারের জীবন-জীবিকার একমাত্র উপায় মাছ ধরা, দিনমজুর ও ভিক্ষাবৃত্তি করা।

তিনি আরও বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই অসহায় প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছি। তবে প্রথম থেকেই আমরা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের দাবি করে আসছি। কিন্তু সে দাবি আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

দশ বছর বয়সে একেবারেই সুস্থ ছিলেন ওই গ্রামের দুই ভাই কাদের ও মনির হোসেন। হঠাৎ করে জ্বর হলে আস্তে আস্তে হাত ও পা শুকিয়ে বিকলাঙ্গ হয়ে যায় তারা। এভাবে ধুকে ধুকে কয়েক বছর আগে মারা যান কাদের। শুধু শুয়ে থেকে এখন মৃত্যুর প্রহর গুণছেন মনিরও। তাদের সেবা করতে গিয়ে তার মাও এখন প্রতিবন্ধী। শুধু মনির নয় সুমাইয়া, অহিদ, কুলসুমসহ এই গ্রামের অনেক শিশুই হঠাৎ করে প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে।

কেউ কেউ প্রতিবন্ধী হচ্ছেন মধ্য বয়স ও বৃদ্ধ বয়সেও। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে কাজ করা পালট বড়ইয়া প্রতিবন্ধী সমিতির হিসেব অনুযায়ী, গোটা জেলার মধ্যে পালট-বড়ইয়া ও দক্ষিণ বড়ইয়ায় প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা অনেক বেশি। এদের অধিকাংশই শারীরিক প্রতিবন্ধী। নিম্ন আয়ের এই পরিবারগুলো তাদের প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে অত্যন্ত অসহায় জীবনযাপন করছেন। অনেকের জীবন আবার অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। তবে হঠাৎ করে প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার এই কারণ অনেকটাই অজ্ঞাত।

স্থানীয় অশিক্ষিত মানুষেরা মনে করছেন, হঠাৎ অসুস্থতা বা পঙ্গুত্ব এই গ্রামের কোনো অভিশাপ। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই প্রতিবন্ধীত্বের বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যাও তুলে ধরতে পারছেন না চিকিৎসকরা।

প্রতিবন্ধী কিশোরী কুলসুমের মা বলেন, ‘অসহায় মেয়েকে আর বহন করতে পারছি না। এমনকি যেখানে নিজেদেরই পেট চলে না সেখানে এই আতুর (প্রতিবন্ধী) মেয়েকে নিয়ে বড়ই বিপদে আছি। নিজের পেটের বলে নিজ হাতে গলা টিপে হত্যাও করতে পারছি না।’

এক এলাকায় এত বেশি প্রতিবন্ধী হওয়ার সঠিক কারণও বলতে পারছেন না চিকিৎসকরা। রাজাপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এ ইউনিয়নে এত বেশি প্রতিবন্ধী ও হঠাৎ করে প্রতিবন্ধী হওয়ার বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে অনেক ক্ষেত্রে অপুষ্টিজনিত বা জেনেটিক কারণে এর সংখ্যা বেশি হতে পারে।’

উপজেলা সমাজসেবা অফিসার ভবানী শঙ্কর বল বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে অসংখ্য প্রতিবন্ধীদের মধ্যে গোটা উপজেলায় মাত্র ৩২৭ জন প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য তা অপ্রতুল। এ উপজেলায় ৩হাজারের মতো প্রতিবন্ধী রয়েছে।

ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া বলেন, ‘এতো সংখ্যক প্রতিবন্ধীর এই বিষয়টি অত্যন্ত ভাবনার বিষয়। ওই এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য ওই এলাকা থেকে ছবি সংগ্রহ করে তা নমুনা হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন আকারে পাঠানো হয়েছে।’

আতিকুর রহমান/এসএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :