আশ্রয়ণের ঘরের এ কী হাল!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বরগুনা
প্রকাশিত: ০৮:৫৪ পিএম, ১৪ অক্টোবর ২০২১

বরগুনার আমতলীতে আশ্রয়ণের ৫৫টি ব্যারাকের ৫৫০টি ঘর সংস্কারের অভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ঘরগুলো গুল্মলতা আর আগাছায় ভরে গেছে। এগুলোতে এখন মানুষের বদলে শিয়াল-কুকুরের বসবাস। ঘরগুলো সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নদীভাঙনে গৃহহারা ও হতদরিদ্র পরিবারগুলোর আবাসনের জন্য ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্থায়নে ও নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গৃহনির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে এ প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় আশ্রয়ণ প্রকল্প। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর জাপান সরকারের সহায়তায় নির্মাণ করা হয় ব্যারাক হাউজ। এ ব্যারাকে ১০টি ঘর রয়েছে।

আমতলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, আমতলী উপজেলায় আটটি আশ্রয়ণ প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পের ৫৫টি ব্যারাকে ৫৫০টি ঘর রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ঘরগুলো সংস্কার না করায় বর্তমানে মানুষের ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ ঘরে এখন আর কোনো পরিবার বসবাস করে না।

আশ্রয়ণের ঘরের এ কী হাল!

গুলিশাখালীর কালীবাড়ি ১০টি ও হলদিয়া ইউনিয়নের সেনের হাটের পূর্বপাশে নির্মিত ঘরে ১০টি পরিবারসহ মোট ২০টি পরিবার থাকার কথা থাকলেও এখন কেউ নেই। ব্যারাক দুটি খালি পড়ে আছে। এ সুযোগে কালীবাড়ি আশ্রয়ণের ঘরের বেড়ার টিন খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।

একই অবস্থা আমতলী সদর ইউনিয়নের গোলবুনিয়া গ্রামের স্লুইচ গেট সংলগ্ন আশ্রয়ণের ১০টি ঘরে। এখানে ১০টি পরিবারের থাকার কথা থাকলেও এখন আছে মাত্র একটি পরিবার। আরপাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের মধ্য যুগিয়ায় চার ব্যারাক হাউজের ৪০ ঘরে মানুষের বসবাস না থাকায় সেখানের দরজা, জানালা, টিন সব চুরি হয়ে গেছে। আমতলী সদর ইউনিয়নের চারঘাট, গুলিশাখালী ইউনিয়নের কলাগাছিয়া এবং হলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া আশ্রয়ণের ঘরেও একই চিত্র দেখা গেছে।

আশ্রয়ণের ঘরের এ কী হাল!

সরেজমিনে দেখা গেছে, কালীবাড়ি এবং দক্ষিণ পশ্চিম আমতলীর গোলবুনিয়া আশ্রয়ণের ঘরের কিছুই নেই। ফাঁকা পড়ে আছে বেড়াবিহীন ঘরগুলো। দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ১৫টি ব্যারাকে ১৫০টি পরিবারের বসবাসের কথা। আছে মাত্র হাতেগোনা ১০-১২টি পরিবার। তারাও চলে যেতে পারেন যে কোনো সময়।

এখানের ১০টি ব্যারাকের কোনো ঘরের চালার টিন নেই, যা আছে তা-ও ছিদ্র হয়ে বর্ষা মৌসুমে পানি পড়ে। গরমের সময় ছিদ্র দিয়ে ঘরে রোদ আসে। নির্মাণের পর সংস্কার না করায় দরজা-জানালা খুলে পড়ে গেছে। বেশিরভাগ ঘরের টিন মরিচা ধরে পড়ে যাওয়ায় লোহার কাঠামো কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার ওপর গুল্মলতা আর বুনো ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। এখানে মানুষের যাতায়াত না থাকায় বাসা বেঁধেছে শিয়াল, কুকুর, সাপ আর বনবিড়াল। ভয়ে কেউ এখন আর আশ্রয়ণের ঘরের ধারে-কাছেও আসেন না।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব ঘর নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে কয়েক বছর না যেতেই ঘরের চাল ছিদ্র হয়ে বৃষ্টির পানি পড়তে শুরু করে। ঘরের মেঝেতে ফাটল ধরেছে। বেশিরভাগ ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

আশ্রয়ণের ঘরের এ কী হাল!

দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া আশ্রয়ণে বসবাস করা যমুনা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ঘরের টিনের চাল সব ছিদ্র হয়ে গেছে। বৃষ্টি এলে পানি পাড়ে। আমরা এখন আর এ ঘরে ঠিকমতো থাকতে পারি না, ঘুমাতে পারি না।

দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া আশ্রয়ণের সম্পাদক দুলাল প্যাদা বলেন, ঘর খারাপ হওয়ায় হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার ছাড়া এখান থেকে সব মানুষ চলে গেছে।

দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া আশ্রয়ণের সভাপতি সুলতান মৃধা বলেন, ঘরের টিন, লোহা, খুঁটি সব নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বসবাসরতরা সবাই চলে গেছেন। মানুষ না থাকায় আশপাশে ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। এহন এ ঘরে মানুষের বদলে সাপ, শিয়াল, কুকুর আর বিড়াল থাকে। আমরা ভয়ে এখন আর আশ্রয়ণে আসি না।

jagonews24

আমতলী সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. মোতাহার উদ্দিন মৃধা বলেন, নির্মাণের পর আশ্রয়ণের ঘর সংস্কার করা হয়নি। ঘরগুলো সংস্কারের অভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলো থাকতে পারছে না। এগুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।

আমতলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মফিজুর রহমান বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো সংস্কারের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ এবং বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. কাওসার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ঘরগুলো পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো যায় কি না সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

এসআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]