তিস্তার তাণ্ডবে পথে বসেছে হাজারো পরিবার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লালমনিরহাট
প্রকাশিত: ০৮:৩৩ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০২১

তিস্তার ভয়াল থাবায় ক্ষত-বিক্ষত তিস্তাপারের হাজারো পরিবার। পানি নেমে গেলেও ক্ষত চিহ্নগুলো জেগে উঠছে। আকস্মিক বন্যায় ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সব ভেসে গেছে নদীর স্রোতে। সামনের দিনগুলোতে কী খেয়ে বেঁচে থাকবেন তা ভাবাচ্ছে এসব পরিবারকে।

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, তিস্তার একদিনের তাণ্ডবে তছনছ হয়েছে ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসলের জমিসহ অসংখ্য স্থাপনা। কৃষকের কয়েকশ মাছের ঘের ভেসে গেছে। ধান, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, রসুনের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। পানি কমে গেলেও কিছু পরিবার এখনো ঘরে উঠতে পারেনি।

jagonews24

হাতীবান্ধা উপজেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গড্ডিমারী ইউনিয়নের দোয়ানী গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম (৩৫) বলেন, এনজিও থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে চারশ হাঁসের খামার করেছিলাম। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় বাড়িঘরসহ সব ভেসে গেছে। এখন ঋণের টাকা পরিশোধ করবো কীভাবে?

একই এলাকার বকতিয়ার হোসেন (৬৭) বলেন, হঠাৎ ফ্লাট বাইপাস সড়কটি ভেঙে গিয়ে আমার ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। এখন এই ভাঙা ঘরগুলোতে অবস্থান করে আছি। মেরামত করার মতো টাকা-পয়সা হাতে নেই।

দোয়ানি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সঙ্গীতা আক্তার বলে, হঠাৎ পানির স্রোত ঘরের মধ্যে ঢুকলে প্রাণ বাঁচাতে আব্বা-আম্মুসহ আমরা দ্রুত গাইড বানের রাস্তায় উঠেছি। আমার বই-খাতাসহ বাড়ির সবকিছু ভেসে গেছে।

jagonews24

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার অনেক আশা করে তিন বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছি। কিন্তু একদিনের বন্যায় সব তছনছ হয়ে গেলো। এখন পরিবার নিয়ে কী খাবো?

উপজেলার তিস্তাপাড়ের সিন্দুর্না ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুরল ইসলাম বলেন, বন্যা মোকাবিলায় কোনো পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় অকাল বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে তিস্তাপাড়ের কৃষক ও সাধারন মানুষ। আকস্মিক এ বন্যায় বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় মানুষ চলাচলের ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। এখনো কিছু পরিবারের বাড়িঘর বন্যার পানি নিচে।

লালমনিরহাটে আকস্মিক এ বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়ন, পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ও কাকিনা ইউনিয়ন, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়ন এবং সদর উপজেলার গোকুন্ডা, রাজপুর ও খুনিয়াগাছ ইউনিয়ন।

jagonews24

এখনো বানের পানিতে তলিয়ে আছে তিস্তাপাড়ের ৩০টি গ্রাম এবং চর ও দ্বীপ চরের ১৫ হাজার একরের বেশি জমির আমন ধান, ভুট্টা, আলু ও বিভিন্ন জাতের শাকসবজি। ভেসে গেছে শতাধিক পুকুরের মাছ।

লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রাম ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার নদীতীরবর্তী কয়েকটি এলাকায় তাণ্ডব চালিয়েছে তিস্তার ঢল। গত মঙ্গলবার দিনগত রাত ১০টার পর থেকে হঠাৎ তিস্তা নদীর পানি বাড়তে থাকে। পরদিন বুধবার (২০ অক্টোবর) বিকেল পর্যন্ত পানি বাড়তে থাকে। এতে প্রায় সাড়ে তিনশ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দহগ্রাম ইউনিয়নের তিস্তা চরাঞ্চলসহ ১ নম্বর ওয়ার্ডের কলোনিপাড়া, সর্দারপাড়া; ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মহিমপাড়া, বড়বাড়ি; ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সৈয়দপাড়া, মুন্সিপাড়া, ক্লিনিক পাড়া; ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাতিপাড়া, কদুআমতলা এলাকায় বন্যায় শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

jagonews24

এদিকে কাকিনা-রংপুর সড়ক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় এখনো লালমনিরহাটের সঙ্গে রংপুর এবং তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাড বাইপাস ভেঙে যাওয়া নীলফামারী, জলঢাকা, বড়খাতার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক শ্যামল জানান, বন্যায় হাতীবান্ধা উপজেলার সঙ্গে সড়ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ চলছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, বন্যাদুর্গত পরিবারগুলোর মাঝে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ কার্যক্রম চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

রবিউল হাসান/এসআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]